ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ৮ বছরে ভর্তি পরীক্ষার আবেদনে খরচ বেড়েছে ৪ গুণ

“১২০০ টাকা বেশি না, মধ্যবিত্ত বহন করতে পারবে। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের পুরো মওকুফ করা উচিত,” বলেন অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন।

বাবা পেশায় দিনমজুর। যে আয় করেন, তা দিয়ে পাঁচজনের সংসারের খাওয়ার খরচ চলে যায়।

মা কাপড় সেলাই করে তিন ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালান।

তিন সন্তানের মধ্যে এবার এইচএসসি পাস করা রিফাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার অর্থ যোগাড় করা তার এবং তার পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় চার ইউনিটে আবেদনের ফি গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে গত আট বছরে ভর্তি পরীক্ষার আবেদনে খরচ বেড়েছে চার গুণ পর্যন্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান; কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা ধরা হয়েছে। চারুকলা ইউনিটের আবেদন ফি ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা।

সবশেষ শিক্ষাবর্ষে চারুকলা অনুষদের ভর্তি ফি ২০০ টাকা বাড়লেও অন্যান্য ইউনিটে অপরিবর্তি ছিল।

এখন একেক ইউনিটে একেক রকম ফি নির্ধারণ হলেও আগে সমান ছিল। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি ছিল ৩৫০ টাকা। ১০০ টাকা বাড়িয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এই ফি ৪৫০ টাকা করা হয়। পরের শিক্ষাবর্ষে (২০২০-২১) আরও ২০০ টাকা বাড়িয়ে আবেদন ফি করা হয় ৬৫০ টাকা।

এরপর ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির আবেদন ফি একলাফে ৩৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে বাড়েনি। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আবেদন ফি আরও ৫০ টাকা বাড়ানো হয়। এর কারণ ছিল আবেদনের অনলাইন সার্ভিস চার্জ ৪০ টাকা বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা এবং মূল ফি ১০ টাকা বাড়ানো।

ভর্তির আবেদনের ফি বাড়ানোর বিষয়ে রিফাত বলেন, “এবার পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছি। ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে চান্স পাব, তা তো নিশ্চিত না। আমাকে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আবেদন করতে হবে। এখন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ইউনিটে আবেদন করতে চাইলে দরকার ৪ হাজার ৫০০ টাকা। যেখানে ঠিকমতো একটা কোচিং করার সুযোগ নাই, সেখানে কীভাবে এত টাকা দেব?

এই দুশ্চিন্তা শুধু রিফাত বা তার পরিবারের নয়, একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলেছে আরও অনেক পরিবার।

উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে তিন সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন সৈয়দা রেজাউন্নহার শিফন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবার বেতন বাড়ছে না। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও সাধারণ দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয় একই রয়ে গেছে। ফলে এসব পরিবার চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।”

আরেক অভিভাবক তৌফিকুর রহমান মিঞা বলেন, তার ছেলে এ বছর এইচএসসি করেছে; জিপিএ ৪ দশমিক ৮৬। এখন সে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক অবস্থা তাদের নেই।

“দুঃখের বিষয়, আমার ছেলে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করবে, আর তাতেই মোট আবেদন ফি চলে আসছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।…আবেদন ফি যদি এত বেশি হয়, তাহলে কীভাবে পরীক্ষা দেওয়াব সন্তানদের? কীভাবে আমাদের স্বপ্ন পূরণ হবে?”

এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি’র দোহাই দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, “সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। কাগজের দাম বেড়ে গেছে। আর গত দুই বছর আমরা ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি বাড়াইনি। এক্ষেত্রে প্রতিবছর যে মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে, সে তুলনায় ১৫০ টাকা কিছুই না। এছাড়া আমাদের চারুকলা ও বিজনেস অনুষদ যে ভর্তি আবেদন ফি নিচ্ছে, তাতে তাদের ব্যয় সংকুলান হচ্ছে না।”

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার আবেদন ফি ১৫০ টাকা বৃদ্ধির কথা শুনে বলেন, “হায় আল্লাহ, আমার সময়ে এত টাকা ভর্তির আবেদন ফি হলে আমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ পড়তেই পারতাম না।”

তিনি বলেন, “এখানে আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে এ আবেদন ফি নির্ধারণ করে না। তারা দেশের মুদ্রাস্ফীতিকে সামনে রেখে কতটুকু বাড়ালে দেশের প্রান্তিক মানুষের ছেলে-মেয়েরাও পরীক্ষা দিতে পারবে, তা বিবেচনা করেনি।

“শুধু শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা ভাবলে তো হবে না। এক্ষেত্রে প্রতিবছর যদি এ হারে বাড়তে থাকে, প্রান্তিক অঞ্চল থেকে ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় আর আসতে পারবে না। প্রতিবছর কত বাড়বে, তার একটা নীতিমালা থাকা উচিত।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১২০০ টাকা ভর্তি আবেদন ফি বেশি না। যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণি আছে, তারা এটা বহন করতে পারবে। বরং তাদের জন্য আবেদন ফি আরও বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য ভর্তি আবেদন ফি পুরোপুরি মওকুফ করা উচিত। এটাই হচ্ছে ‘বৈষম্য নিরসন’। আর গরিব-ধনী দুপক্ষ যদি সমান টাকা দেয়, সেটাই বৈষম্য সৃষ্টি করে। আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই ফলো করে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নাগরিকদের সক্ষমতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি দাম চাপিয়ে দিয়েছে সকল পণ্য ও সেবায়।

এই ধারাবাহিকতায় এখন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ফি ১৫০ টাকা বাড়িয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং অযৌক্তিক। এই আরোপিত ফি অবশ্যই বাতিল করতে হবে। আমরা ডাকসুর পক্ষ থেকে ভিসি কার্যালয়ে এই বিষয়ে যাব এবং এই সিদ্ধান্ত সংশোধনের জন্য চাপ প্রয়োগ করব।”

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন ইউনিটে ভর্তির আবেদন ফি প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছে। এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণকে আরও ত্বরান্বিত এবং শিক্ষার অধিকারকে আরও সংকুচিত করবে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি সংকটে পড়বে।”

বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সামি আব্দুল্লাহ বলেন, “প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে ফি বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষাকে ব্যবসায়িক আয়ের উৎসে পরিণত করেছে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করতেই দেড় হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগটুকুও এখন আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল।”

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফি বাড়ানোর বিষয়ে ছাত্র সংগঠনসহ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে কোনো মতামত না নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অংশীদারদের বাদ দিয়েই সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া।

“এসব বিষয়ে সব পক্ষের যথাযথ মতামত গ্রহণপূর্বক শিক্ষার্থীদের সীমিত আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ভর্তি আবেদনের ফিসহ অন্যান্য খরচ কমিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করি।”

করের বিকল্প যখন রেমিটেন্স: জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রের ‘সহজ এক্সিট’ তত্ত্ব

বিচারহীনতার দশ বছর: সাঁওতালদের ভিটা বাগদাফার্মে কার স্বার্থে ইপিজেড?

মসনদে টান ওদের, দমবন্ধ কিন্তু আমাদেরই

জাতীয়