মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ চলতি বছর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাসে এ তথ্য বলা হয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলার। অন্যদিকে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৭৪৯ ডলার হতে পারে। অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে ১৩৭ ডলার এগিয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশ।

রোববার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ। দেশটির অর্থনীতির আকার ২০২৬ সালে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে ভারতের অর্থনীতির আকার হতে পারে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়। তারপরও মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।

তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে, সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে গেছে। বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্যের মতো সূচক বিবেচনায় নিলে দুই দেশের অর্থনীতির চিত্রে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য।

আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ৮৮৬ ডলার ও ভারতের ২ হাজার ৭৪৯ ডলার হতে পারে। তবে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি বিবেচনায় নিলে চিত্রটি ভিন্ন। এ হিসাবে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বিবেচনায় ভারতীয়দের গড় ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে বেশি।

দুই দেশের মধ্যে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে তা ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি।

এ ছাড়া আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছর ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিতে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে বাংলাদেশ।

তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার। আর বিশ্বব্যাপী এ গড় প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার। সে তুলনায় বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি এখনো অনেক কম।

২০২৭- ২০২৮ সালেও এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালেও মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলার এবং ভারতের ৩ হাজার ৩৬ ডলার হতে পারে। ২০২৮ সালেও ব্যবধান সামান্য থাকলেও বাংলাদেশ এগিয়ে থাকতে পারে।

তবে ২০২৯ সালে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির পেছনে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত দুই দশকে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের ওপর ভর করে দেশটির অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি।

ভারতের অর্থনীতি অবশ্য তুলনামূলক বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ। দেশটির উৎপাদনশিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও সেবা খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, প্রযুক্তি খাত এবং শিল্পভিত্তি ভারতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রার মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও দীর্ঘ মেয়াদে কমেছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিবাচক দিক বলে মনে করেন তিনি।

তবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এ ছাড়া লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পোশাক রপ্তানির পণ্য পরিবহনের পথেও বিঘ্ন ঘটছে। এতে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ টানা সাত বছর মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবে ২০২৫ সালে ভারত আবারো বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায়।

জাতীয়