আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রোববার অনুষ্ঠিত ভোটে মধ্য-বামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী আন্তোনিও জোসে সেগুরো ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী আন্দ্রে ভেনচুরাকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। প্রায় সম্পূর্ণ ভোট গণনা শেষে পাওয়া ফলাফলে দেখা যায়, সেগুরো মোট ভোটের ৬৬.৮ শতাংশ অর্জন করেছেন, আর ভেনচুরা পেয়েছেন ৩৩.২ শতাংশ। এর মাধ্যমে সেগুরো বিদায়ী রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট মার্সেলো রেবেলো দে সউসার উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পথে এগিয়ে গেলেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ৯৯ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৬৩ বছর বয়সী সেগুরোর এই জয় দেশটির রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্য-বামপন্থী ও মধ্য-ডানপন্থী শক্তির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রয়েছে। প্রেসিডেন্টের পদটি পর্তুগালে মূলত প্রতীকী হলেও রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষা, সংবিধানগত দায়িত্ব পালন এবং সংসদীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
চলতি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। ভোটের আগের দুই সপ্তাহে দেশজুড়ে টানা ঝড় ও প্রবল বাতাসে জনজীবন ব্যাহত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত সাতজন নিহত হন এবং অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো সমপরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০টি নির্বাচনী আসনে ভোটগ্রহণ এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ যোগ্য ভোটারের জন্য দেশের অধিকাংশ এলাকায় নির্ধারিত সময়েই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
নির্বাচনের দিন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝড়ের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করা হয়, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। বিশ্লেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও ভোটার উপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।
ফলাফল ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত সেগুরো এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, এই বিজয় কোনো একক দল বা ব্যক্তির নয়; এটি পর্তুগালের জনগণ ও গণতন্ত্রের জয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেকে ‘সব পর্তুগিজের প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন এবং রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্য জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর বক্তব্যে সামাজিক সংহতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ইউরোপীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
অন্যদিকে, পরাজিত প্রার্থী আন্দ্রে ভেনচুরা ফলাফল মেনে নিয়ে বলেন, তাঁর দল নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা ফল অর্জন করেছে। তিনি দাবি করেন, এই ফলাফল পর্তুগালের রাজনৈতিক অঙ্গনে ডানপন্থী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। ভেনচুরা তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দেশের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে প্রস্তুত থাকবে।
এই নির্বাচনের ফল ইউরোপীয় রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্ব এবং ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সেগুরোর জয়কে স্বাগত জানিয়ে পর্তুগালের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। পর্তুগাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেগুরোর জয় পর্তুগালে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। একই সঙ্গে ডানপন্থী শক্তির উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি ভবিষ্যৎ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সামাজিক সংহতি জোরদারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।


