অর্থনীতি ডেস্ক
দেশের পাট খাতকে বর্তমানের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় থেকে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে সরকার। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, উন্নত বীজ উৎপাদন এবং বহুমুখী পাটপণ্যের প্রসারের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার ফার্মগেটে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী ‘বহুমুখী পাটপণ্য মেলা-২০২৬’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই তথ্য জানান। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে পাট খাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই আসত পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। তৎকালীন সময়ে দেশের মোট ৩৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের মধ্যে পাট খাতের অবদান ছিল ৩১৩ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান সময়ে দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও, পাট খাতের অবদান এখনো ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে পাট খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে নতুনভাবে কাজে লাগাতে সরকার সময়োপযোগী ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
পাট খাতের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উন্নত মানের পাটবীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনকে সরকারের প্রথম লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার টন পাটবীজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে মানসম্মত পাটবীজ উৎপাদন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে চাষী পর্যায়ে মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা সহজ হবে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, মাঠপর্যায়ে পাটচাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন উন্নত নকশা উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। এই উদ্দেশ্য সফল করতে সরকার গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া, পাট ও চামড়া খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নত বীজ উদ্ভাবন, নতুন পণ্য উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী ডিজাইন তৈরিতে সহযোগিতা জোরদার করতে চীনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
খাতটির সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে দ্রুত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মুনাফাভিত্তিক দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে সরকার সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার আওতায় পাট খাতের প্রতিটি পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম বলেন, পাট শিল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক বিপ্লবকে সফল করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাট খাত তার অতীত গৌরব ফিরে পেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাটচাষী ও এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। একই সঙ্গে দেশের গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।
আনুষ্ঠানিক বক্তব্য শেষে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বহুমুখী পাটপণ্য মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং উপস্থিত উদ্যোক্তাদের সঙ্গে পাটপণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের কৌশল ও বিদ্যমান নীতিগত সমস্যাবলি নিয়ে আলোচনা করেন।
আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আয়োজিত এই মেলা আগামী ২৩ মে পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত বৈচিত্র্যময় ও পরিবেশবান্ধব পাটপণ্য প্রদর্শন করছেন।


