আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় চলমান সংকট এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দায়বদ্ধতার দাবিতে টানা তিন সপ্তাহ ধরে অনশনরত সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। রবিবার দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে নিজের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক হাতে লেখা বার্তায় তিনি এই অবস্থানের কথা জানান।
সোনম ওয়াংচুকের শর্তানুসারে, প্রথমত, সরকারকে সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনিয়মগুলোর দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর নেতারা যদি সংসদে শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহিতার বিষয়টি উত্থাপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস প্রদান করেন, তবেই তিনি অনশন প্রত্যাহার করবেন। ওয়াংচুক স্পষ্ট করেছেন যে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও, যদি সংসদীয় নেতারা হাসপাতালে এসে এই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি করেন, তবেই তিনি তার দীর্ঘদিনের অনশন শেষ করবেন।
গত শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত অবস্থায় শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমো জানিয়েছেন, ওয়াংচুক বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকলেও তিনি কোনো ধরনের স্যালাইন বা পুষ্টিকর তরল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। হাইকোর্টে তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের আবেদন করা হলেও তা সফল হয়নি। হাসপাতাল থেকে পাঠানো বার্তায় সোনম ওয়াংচুক দাবি করেছেন যে, তাকে সেখানে ‘অবৈধভাবে’ আটকে রাখা হয়েছে এবং তার মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতে চলমান এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় গত মে মাসে, যখন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে গত ২৮ জুন সোনম ওয়াংচুক আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। ২০ দিন অনশন করার পর শনিবার তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এদিকে সোমবার সিজেপির ডাকা ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচির প্রাক্কালে আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)-এর সদস্যদের অনশন কর্মসূচি রবিবার ২১তম দিনে গড়িয়েছে। একই সঙ্গে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ নতুন করে অনশনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, সোমবারের কর্মসূচি চলাকালে বহিরাগত কেউ ছদ্মবেশে প্রবেশ করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীতে আন্দোলন দমনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সোনম ওয়াংচুক তার সমর্থকদের ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তাই কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা যেন এই লক্ষ্যকে ব্যাহত না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের এই আন্দোলন ভারতের উচ্চশিক্ষা খাতের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না আসলেও, সংসদীয় অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।


