স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতায় নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ ইসির

স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতায় নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ ইসির

জাতীয় ডেস্ক

দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক, ঋণখেলাপি, ঋণের জামিনদার এবং ইউটিলিটি বিল বকেয়া থাকা ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার আইনি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত ইসির ১২তম কমিশন সভায় পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী আইন পর্যালোচনার পর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের এসব সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনী আইন সংশোধন করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তুতকৃত প্রস্তাবিত আইনি সংশোধনীর খসড়া নীতিগত অনুমোদনের জন্য শিগগিরই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবনার পর আইন পরিবর্তন বা পরিমার্জনের মূল দায়িত্ব সরকারের। প্রস্তাবসমূহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন শেষে সংসদে বিল পাস হলে তা চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর রূপ লাভ করবে।

বিদ্যমান নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা ছিল না। তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অনুদান ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের বিষয়টিকে লাভজনক পদের সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে কমিশন মনে করছে, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে। এই যুক্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকদের প্রভাবমুক্ত রাখতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতায় অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আর্থিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। নতুন প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজে ঋণখেলাপি হলে, অন্যের ঋণের জামিনদার হিসেবে দায়বদ্ধ থেকে বকেয়া খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলে কিংবা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো ইউটিলিটি সেবার বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে তিনি স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পেশিশক্তি ও আর্থিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যেই ইসি এই কঠোর ধারা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে কমিশন সভায়। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশে ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সের নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করে এনআইডি ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হয়। তবে তথ্য সংগৃহীত হলেও ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে পর্যন্ত তারা আইনগতভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের যাবতীয় তথ্য ‘ডরম্যান্ট’ বা সুপ্ত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে এবং ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই স্বয়ংসক্রিয়ভাবে তাদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়।

ইসি সচিব আরও উল্লেখ করেন, কমিশন বর্তমানে তথ্য সংগ্রহের এই সর্বনিম্ন বয়সসীমা আরও কমিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে তুলনামূলক পর্যালোচনা করছে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তর, অষ্টম শ্রেণি কিংবা মাধ্যমিক (এসএসসি) স্তর থেকে নাগরিক তথ্য সংগ্রহ শুরু করা কতটা কার্যকর ও প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক হবে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যাচাই সাপেক্ষে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে নির্বাচন কমিশন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতা স্থগিত করার প্রস্তাব পাস হলে তা গ্রামীণ রাজনীতি ও স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। এতদিন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় শিক্ষকসমাজ বড় একটি ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। নতুন নীতি কার্যকর হলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই এবং জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন মেরুকরণ ঘটবে। অন্যদিকে, কম বয়স থেকে নাগরিকদের এনআইডি তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ ভবিষ্যতে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ