আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজায় চলমান সংঘাতের ভয়াবহ সামাজিক ও মানবিক ক্ষত দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সামরিক অভিযানের ফলে উপত্যকাটির মৌলিক অবকাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘাত ও অভিযানে গাজা উপত্যকায় ৬০ হাজারের বেশি শিশু তাদের অন্তত একজন অভিভাবককে হারিয়েছে। একই সঙ্গে অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযানে বহু পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, যার ফলে তারা প্রশাসনিক ও সামাজিক ইতিহাস থেকেও মুছে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, চলমান সংঘাতের কারণে এ পর্যন্ত মোট ৬০ হাজার ৭৩৭ জন শিশু তাদের বাবা অথবা মায়ের অন্তত একজনকে হারিয়ে অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়েছে। নিহতদের মধ্যে বিশাল একটি অংশই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বিশদ তথ্যে দেখা যায়, এসব শিশুদের মধ্যে ৫২ হাজার ৯৫ জন শিশু তাদের বাবাকে হারিয়েছে, অন্যদিকে ৫,৯২৯ জন শিশু মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর বাইরে ২,৭১৩ জন শিশু তাদের বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, যেকোনো সাম্প্রতিক সংকটে এত দ্রুততম সময়ে শিশুদের পিতামাতা হারানোর ঘটনা এটাই সর্বোচ্চ, যা পুরো অঞ্চলের শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিবেদনে পরিবারগুলোর ওপর এই যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক রূপটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ধারাবাহিক হামলায় গাজা উপত্যকার অন্তত ২,২৭৬টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এসব পরিবারের মোট সদস্যসংখ্যা ছিল ৮,৮৫৮ জন। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই পরিবারগুলোর কোনো একক সদস্যও আর জীবিত নেই। এর ফলে তাদের পুরো বংশলতিকা অবলুপ্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বেসামরিক প্রশাসন বাধ্য হয়ে তাদের নাম গাজার নাগরিক নিবন্ধন বা জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্ট্রি থেকে স্থায়ীভাবে মুছে দিয়েছে। কোনো পরিবারের সদস্য জীবিত না থাকায় পরবর্তী প্রজন্মের প্রশাসনিক পরিচয় প্রকাশের পথও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া সামরিক হামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিভিন্ন সময় মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে আংশিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান সংঘাত বন্ধ হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকরের পরও উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। কেবল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই নতুন করে অন্তত ১,১০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা ওই অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
সংঘাতের কারণে উপত্যকার আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। গাজার অধিকাংশ হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এতিম ও গৃহহীন শিশুদের সহায়তা প্রদান অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে বহু পরিবার তাবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে, যেখানে তীব্র খাদ্য সংকট, পানীয় জলের অভাব এবং সংক্রামক রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। পিতা-মাতাহীন শিশুরা এখন চরম পুষ্টিহীনতা ও মানসিক স্বাস্থ্যজনিত মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অভিভাবক হারানো শিশুদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়, নিরাপদ খাদ্য, শিক্ষা এবং মানসিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে সংঘাত-পরবর্তী গাজায় এক বিপর্যস্ত প্রজন্মের সৃষ্টি হবে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগঠনগুলোর অবিলম্বে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে এই অভিভাবকহীন শিশুদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হয়।


