আইন ও বিচার ডেস্ক
সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় তা ভোগ-দখলের পূর্ণ অধিকার বাবা-মায়ের হাতে রাখার বিধান যুক্ত করে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ (ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট) সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত এই আইনি পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন প্রবীণ বয়সে সন্তান কর্তৃক বাবা-মায়ের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার ঝুঁকি হ্রাস পাবে, অন্যদিকে দেশের আদালতগুলোতে সম্পত্তি বণ্টন ও হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত দেওয়ানি (সিভিল) মামলার জট উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। সরকারের এই আইনি সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য দেশের সার্বিক বিচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম আইনে ‘হেবা’, হিন্দু আইনে ‘উইল’ এবং একই সঙ্গে মুসলিম আইনি প্রক্রিয়ায় ‘ওয়াসিয়তনামা’র মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত হেবা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি হেবা বা দান করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উক্ত সম্পত্তির ওপর তাদের সমস্ত আইনি নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা অধিকার হারিয়ে ফেলেন। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা সম্পূর্ণভাবে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, যা প্রবীণদের চরম অসহায় ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।
বিদ্যমান এই সংকট নিরসনে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’-এর অধীনে সাধারণ উপহার বা গিফটের বিধানটির পাশাপাশি ১৯৬৩ সালের একটি ঐতিহাসিক বিচারিক নজিরের (সুপ্রিম কোর্টের রায়) আলোকে আইনি কাঠামোটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ বা জীবনস্বত্বের সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি যুক্ত করা হবে। এই জীবনস্বত্বের বিধান কার্যকর হলে বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর বা রেজিস্ট্রি করে দিলেও নিজেদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তা ভোগ-দখল ও ব্যবহারের পূর্ণ এখতিয়ার তাদের হাতেই সংরক্ষিত থাকবে।
সংশোধিত আইনি কাঠামোয় মূল সুরক্ষার জায়গায় বিধান রাখা হচ্ছে যে, বাবা-মায়ের জীবনদশায় উভয়ের সম্মতি ছাড়া উক্ত সম্পত্তি কোনোভাবেই বিক্রি বা অন্য কারো কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। অর্থাৎ, বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া সন্তান যেমন আইনিভাবে সম্পত্তিটি বিক্রি করতে পারবে না, তেমনি বাবা বা মা চাইলেও একক সিদ্ধান্তে সন্তানকে বঞ্চিত করে সেটি বিক্রি করার এখতিয়ার রাখবেন না। হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
তবে বিশেষ কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আইনে কিছু বাস্তবসম্মত ছাড়ের সুযোগও রাখা হচ্ছে। যদি এমন কোনো পারিবারিক সংকট তৈরি হয়, যেখানে বাবা বা মায়ের জরুরি চিকিৎসার খরচ জোগাতে সম্পত্তি বিক্রি করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, কিন্তু সন্তান তাতে সম্মতি দিচ্ছে না—এমন পরিস্থিতিতে জেলা জজ আদালতকে বিশেষ প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধ পক্ষ জেলা জজের নিকট আবেদন জানালে আদালত সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিক্রির অনুমতি প্রদান করবেন।
আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিপুল সংখ্যক মামলার পেছনে পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ অন্যতম প্রধান কারণ। এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জমিজমাজনিত নতুন মামলার সংখ্যা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। বিচার ব্যবস্থার জটিলতা কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সুরক্ষা পৌঁছানো এবং প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই সংশোধনের মূল লক্ষ্য।


