জাতীয় ডেস্ক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরও রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডস্থ তথ্য ভবন মিলনায়তনে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা গেলেও প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও জনমানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ব্যতীত জুলাই অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, বিপুল মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর আশা করা হয়েছিল যে প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি এখনো স্বস্থানে বহাল রয়েছে। অতীতে যারা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করত কিংবা সরকারি কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত, তারা এখনো একই অপচর্চায় লিপ্ত রয়েছে। অনেকে ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের অবস্থান ও পরিচয় বদলে নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও বয়সের কথা উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, প্রকৃতপক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রে যে টেকসই ও মৌলিক পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন, তা এখনো অর্জিত হয়নি।
প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা থাকলেও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী নানা উদ্যোগের মধ্যে পরিবর্তনের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নজির স্থাপন করতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশ গঠনে তাঁর এসব ইতিবাচক উদ্যোগকে সফল করতে হলে সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারপ্রধানকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান অতিথি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস মূলত সংগ্রামের মাধ্যমে রূপান্তরের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি বড় পরিবর্তনের জন্যই বাঙালি জাতিকে অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া জুলাই আন্দোলন প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট একটি অধিকার আদায়ের দাবি থেকে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে তা স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের রূপ নেয়। এ আন্দোলনে বহু মেধাবী তরুণ শহীদ হয়েছেন এবং অসংখ্য পরিবার তাঁদের সন্তানদের হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। শহীদদের এই মহান আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন দেশে একটি অসাম্প্রদায়িক, মেধাভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও তরুণবান্ধব রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা যাবে।
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গত ১৭ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতন, কারাবরণ ও অসংখ্য মিথ্যা মামলার পটভূমিতেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম হয়েছে। ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঐক্যবদ্ধ কৌশলে আন্দোলনটি সর্বজনীন রূপ পেয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তারই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। তথ্যমন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধকে যেমন কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যবসায়িক প্রকল্পে রূপান্তর করা সমীচীন নয়, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকেও কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আদর্শ রক্ষা এবং আন্দোলনে সংগঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানান। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এ কে এম আবদুল হাকিম অভ্যুত্থানকালীন সকল হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী অপশক্তির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সম্মানজনক সহায়তার দাবি জানান। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমিকে বাদ দিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে দেখলে এর প্রকৃত প্রেক্ষাপট আড়াল হয়ে যাবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ স্কাউটসের উপ-প্রধান জাতীয় কমিশনার মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ, পিএসসির সদস্য চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস এবং প্রবীণ সাংবাদিক মারুফ কামাল খানসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভার পূর্বে তথ্য অধিদপ্তরের বিশেষ স্মারক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন এবং শহীদদের স্মরণে আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। প্রদর্শনীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর ঘটনাবহুল আলোকচিত্রের পাশাপাশি অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের খবর সংবলিত জাতীয় দৈনিকগুলোর ঐতিহাসিক প্রথম পাতা স্থান পায়। আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।


