অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশসহ বিশ্বের নির্ধারিত ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য ব্যবসা ও পর্যটন ভিসায় ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত নেওয়ার নিয়ম স্থায়ী করতে যাচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। মার্কিন সরকারের প্রকাশিত ফেডারেল রেজিস্টারের একটি বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানা গেছে। পরীক্ষামূলক কর্মসূচির পর এখন চূড়ান্ত বিধিমালা জারির মাধ্যমে এই নীতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া হচ্ছে। নতুন বিধিতে ভিসা অনুমোদনের শর্ত হিসেবে জামানতের সর্বোচ্চ পরিমাণ বাড়িয়ে ২০ হাজার মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগামী ৩ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন নিয়মটি বি-১ (স্বল্পমেয়াদী ব্যবসায়িক ভ্রমণ) ও বি-২ (পর্যটন ও বিনোদন) ভিসার আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ভিসা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তা যদি প্রয়োজন মনে করেন, তবে আবেদনের চূড়ান্ত শর্ত হিসেবে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত বন্ড জমা দিতে বলবেন। কনস্যুলার কর্মকর্তার একক মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
এর আগে ২০২৫ সালে ১২ মাস মেয়াদী একটি পাইলট বা পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় এই ভিসা বন্ড প্রথা প্রথম চালু করা হয়েছিল। ওই কর্মসূচিতে কনস্যুলার কর্মকর্তারা ৫ হাজার, ১০ হাজার বা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার জামানত নেওয়ার সুযোগ পেতেন। তবে পরীক্ষামূলক পর্ব শেষে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ৫ হাজার ডলারের নিম্নতম ধাপটি বাতিল করে ১০ হাজার, ১৫ হাজার ও সর্বোচ্চ ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যে ৫০টি দেশের নাগরিকদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩০টি দেশই আফ্রিকার। আর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল ও ভুটান রয়েছে এই তালিকায়। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই দেশগুলোর সাধারণ ভ্রমণকারী, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াতের ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যমানের আর্থিক শর্তের মুখোমুখি হতে হবে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিসার মেয়াদের অতিরিক্ত সময় (ওভারস্টে) যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার প্রবণতা কমাতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, পাইলট প্রজেক্টের উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে জামানত প্রথা প্রয়োগের ফলে শর্ত মেনে ভিসা ধারকদের সময়মতো নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার হার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তবে অভিবাসন অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা মার্কিন সরকারের এই কঠোর নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। অধিকারকর্মীদের মতে, এ ধরনের বিপুল অঙ্কের জামানতের শর্ত বৈশ্বিক পর্যায়ে বৈধ ভ্রমণকারীদের অনাবশ্যকভাবে নিরুৎসাহিত করবে। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক অভিবাসন নীতি স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও যথাযথ আইনি অধিকারের পরিপন্থী এবং তা নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
মার্কিন প্রশাসন তাদের এই পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে দেশটিতে বৈধ উপায়ে প্রবেশের প্রক্রিয়াও জটিল করা হয়েছে। প্রক্রিয়াকরণ ফি বৃদ্ধি ছাড়াও নতুন ভিসা আবেদনকারী এবং দেশে অবস্থানরত অভিবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তল্লাশির পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
কূটনৈতিক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর এ ধরনের বিশাল আর্থিক শর্ত আরোপের ফলে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক যাতায়াত এবং সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাহত হতে পারে। জামানতের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকলেও, মূল অর্থ জমা করার সামর্থ্য অনেকেরই না থাকায় এটি পর্যটন ও ব্যবসায়িক খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।


