বিদ্যুৎ গ্রিডে বড় বিপর্যয়: বিদ্যুৎহীন পুরো কিউবা

বিদ্যুৎ গ্রিডে বড় বিপর্যয়: বিদ্যুৎহীন পুরো কিউবা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ায় কিউবায় আবারও দেশজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্রটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রিক ইউনিয়ন (ইউএনই) জানিয়েছে, রোববার গভীর রাতে বিদ্যুৎ গ্রিডে এ ধস নামে। তবে কী কারণে এ বিপর্যয় ঘটেছে কিংবা কখন নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।

বিভ্রাটের আগেই রাজধানী হাভানার বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অপর্যাপ্ত উৎপাদনক্ষমতার কারণে পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের কথা জানিয়েছিল। একই সঙ্গে একাধিক প্রধান ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সার্কিট বিকল হওয়ার মতো কারিগরি জটিলতাও তৈরি হয়। ফলে রাজধানীর গুয়ানাবাকোয়া, হাবানা দেল এস্তে, লা লিসা এবং মারিয়ানোসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত পুরো জাতীয় গ্রিডকে অচল করে দেয়।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় কর্তৃপক্ষ সাধারণত হাসপাতাল, পানি শোধনাগার এবং খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কৌশল গ্রহণ করে থাকে। এজন্য ছোট পরিসরে আঞ্চলিক মাইক্রোগ্রিড চালু করে ধাপে ধাপে বড় তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পুনরায় জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়। তবে কারিগরি সক্ষমতার ঘাটতি ও পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে এই প্রক্রিয়া চরম ধীরগতির হয়ে পড়েছে।

চলতি বছরে কিউবায় ধারাবাহিক জাতীয় বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটছে। এর আগে গত জুলাই মাসেই মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে তিনবার দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। সে সময় প্রায় এক কোটি মানুষ টানা একাধিক দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় চরম ভোগান্তির শিকার হন। নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে চালু করা হলেও চাহিদার তুলনায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কম থাকায় স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না।

দীর্ঘদিনের অবহেলা, যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এখন ভঙ্গুর রূপ নিয়েছে। দেশটির প্রধান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বয়স ৩০ বছরেরও বেশি, যা নতুন বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

এই সংকটকে কেন্দ্র করে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনও স্পষ্ট। কিউবা সরকারের মতে, ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধই এই সংকটের প্রধান কারণ। মার্কিন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় মেকানিক্যাল সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও মূলধনী অর্থায়ন সংগ্রহ করতে পারছে না।

এর পাশাপাশি মারাত্মক রূপ নিয়েছে জ্বালানি সংকট। ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ থাকলেও সার্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন রাজস্ব চাপের কারণে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের মুখে আরেক আঞ্চলিক শক্তি মেক্সিকো থেকেও কিউবায় অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জ্বালানির বিকল্প সব পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

টানা লোডশেডিংয়ের কারণে দেশটিতে যোগাযোগ, পরিবহণ, জনস্বাস্থ্য ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। কারিগরি অচলাবস্থার পাশাপাশি গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ ও দৈনন্দিন গৃহস্থালি জীবনযাপন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, যা ক্যারিবীয় এই দেশটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ