আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র পানিসংকট এবং নদী ব্যবস্থাপনার অবক্ষয়ের কারণে সমগ্র অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে। বৈচিত্র্যময় খাদ্য ব্যবস্থা রক্ষা করা, ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং সার্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে অববাহিকাভিত্তিক টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
মঙ্গলবার সকালে এডিবির ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক এই উন্নয়ন সংস্থার মতে, বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধার্ধের বেশি মানুষ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস করলেও বৈশ্বিক নিরিখে এখানে বিশুদ্ধ পানির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে এ অঞ্চলে বিশ্বের মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র ৩০ শতাংশ এবং ব্যবহারযোগ্য বিশুদ্ধ পানির মাত্র ২৮ শতাংশ রয়েছে। এই সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করেই প্রায় চার বিলিয়নেরও বেশি জনগোষ্ঠীর খাদ্যের সংস্থান করতে হচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কৃষিজমিই এখন তীব্র পানিপ্রাপ্যতার সংকটে ভুগছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এশিয়ার প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনে সেচের বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিক ফলনের আশায় অপরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত সার ও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ফলে একদিকে নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি।
পানি সংকটের এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব। এশিয়ার প্রধান নদীগুলোর মূল উৎস হলো হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ, যার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে চলতি শতাব্দীর মধ্যেই এই হিমবাহের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে নদীতে পানির প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেবে পানির চরম সংকট। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইতোমধ্যেই পাকিস্তান, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি অর্থনীতি ও নদী অববাহিকায় ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে।
এডিবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিগত দশকগুলোতে কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ক্ষুধা নিরসনে ভূমিকা রাখলেও পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার পানির স্তর আশঙ্কাজনক গতিতে নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, নদী দিয়ে প্রবাহিত অতিরিক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণহীন এলাকা বা ‘ডেড জোন’। তাছাড়া কেবল ক্যালরিভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনে অতিরিক্ত জোর দেওয়ায় জনগণের সুষম পুষ্টির চাহিদা অপূরণীয় থেকে যাচ্ছে। দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি শোষণে চরম বাধা সৃষ্টি করছে।
এই প্রতিকূল চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হলে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করে এডিবি। সংস্থার মতে, ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে বদ্বীপ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষ করে উজানের বনাঞ্চল সংরক্ষণ করতে পারলে ভাটির অঞ্চলে বন্যার তাণ্ডব হ্রাস পাবে এবং সেচ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকবে। পানিকে একটি অমূল্য প্রাকৃতিক মূলধন হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় পরিকল্পনা সাজালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে কৃষি ও শিল্প খাতকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে কেবল সর্বোচ্চ ফলন বাড়ানোর প্রথাগত নীতি থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার দিকে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিন্দুকালীন সেচ বা ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ পদ্ধতির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সেচের পানির অপচয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এর পাশাপাশি এককভাবে ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে উদ্যানপালন ও বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের প্রসার ঘটালে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ হ্রাস পাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মতো সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগগুলোর পৃথকভাবে কাজ না করে সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার অধীনে কাজ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও জোর দেওয়া হয়েছে যে, স্বল্পমেয়াদি সাময়িক পদক্ষেপের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সেচ আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় নদীর পানি পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাও জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের সম্পৃক্ত করা হলে সেচ কাঠামোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। সামগ্রিকভাবে, নদীর সুস্থতা ও সুরক্ষাকে কেবল পরিবেশগত বিষয় হিসেবে না দেখে সমগ্র এশিয়ার ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুনিশ্চিত করার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।


