ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েছেন। সম্প্রতি ফিফা বিশ্বকাপসহ সংস্থাটির প্রধান আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব ও পরিচালনা কাঠামোর একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার পর এই বৈশ্বিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামক একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক বিনিয়োগ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন ইনফান্তিনো। তবে বিশ্বের প্রধান মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর তীব্র প্রতিরোধ, প্রতিযোগিতা বর্জনের হুমকি এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের ব্যাপক সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত এই উচ্চাভিলাষী প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপের স্বত্ব প্রাইভেটাইজেশন বা বেসরকারীকরণের খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্ব ফুটবলের তিন প্রধান চালিকাশক্তি—ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা (উয়েফা), উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল জোট (কনকাকাফ) এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। মহাদেশীয় সংস্থাগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ফুটবল কেবল কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয় এবং বিশ্বসংস্থার স্বকীয়তা বিকিয়ে দিয়ে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। উয়েফা এক বিবৃতিতে হুশিয়ারি দেয়, এই বিতর্কিত প্রস্তাব বহাল থাকলে তাদের আওতাধীন কোনো জাতীয় দল ফিফার আয়োজিত কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না। একইভাবে কনকাকাফ ও এএফসি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভাব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। সার্বিয়া ও সুইডেনসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইনফান্তিনোর ওপর থেকে রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন।
এই নজিরবিহীন প্রশাসনিক বিপর্যয় ও বৈশ্বিক কোণঠাসা পরিস্থিতির পর ফিফার শীর্ষ পদে ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ ফুটবল নীতিনির্ধারকেরা এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য সদস্য দেশগুলোকে সংগঠিত করে ইনফান্তিনোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এবং পুনর্নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করার লক্ষ্যে নতুন প্রশাসনিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে ফুটবল রাজনীতির এই জটিল সংকটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক প্রভাব ও কৌশলগত সমর্থন ইনফান্তিনোর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ৪৮ দেশের বর্ধিত আকারের বিশ্বকাপ আয়োজন ও পরিচালনার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা প্রধানের মধ্যকার ব্যক্তিগত ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় রূপ লাভ করে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ফিফার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো ভোটাধিকার কিংবা আইনি ভূমিকা না থাকলেও, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব অত্যন্ত প্রখর। বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে ইনফান্তিনোর সমর্থন অটুট রাখার প্রয়াস চালানো হতে পারে বলে ধারণা করছেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের ছোট ও উদীয়মান দেশগুলো ফিফার আর্থিক অনুদান ও উন্নয়ন তহবিলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাতিল হওয়া মডেলেও এই সদস্য দেশগুলোকে অতিরিক্ত বার্ষিক অনুদান দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা সেসব দেশে ইনফান্তিনোর শক্তিশালী এক সমর্থক গোষ্ঠী ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক ক্ষমতা বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক ভোট ব্যাংক নিশ্চিত করতে ইনফান্তিনো ওয়াশিংটনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কতটুকু ব্যবহার করতে পারবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ইউরোপীয় জোটের কঠোর অবস্থান এবং অন্যান্য মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলোর অভূতপূর্ব ঐক্য ফিফা সভাপতির একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগামী দিনে এই মতবিরোধ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ নিরসন করা না গেলে বিশ্ব ফুটবল ব্যবস্থাপনা আরও গভীর সংকট ও প্রশাসনিক অচল অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে।


