জাতীয় ডেস্ক
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেকোনো ধরণের বক্তব্য, বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার প্রচার ও সম্প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সাথে বিচার বিভাগের এই আদেশ অমান্য করে কোনো গণমাধ্যম বা ব্যক্তি যদি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রকাশ বা প্রচার করে, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই নীতিগত ও আইনি অবস্থানের কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক বা রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচারের ওপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। আদালতের বিচারিক নির্দেশনা কার্যকর নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ। পূর্বেই এ সংক্রান্ত বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে গণমাধ্যমগুলোর সচেতনতার জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। এরপরও যদি কোনো গণমাধ্যম পূর্বঘোষণা দিয়ে কিংবা সরাসরি শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্য বা অডিও-ভিডিও বার্তা প্রচার করে, তবে সেটি স্পষ্টত বিচার বিভাগের নির্দেশনার অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে আইনি শাসন বজায় রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
সংবাদমাধ্যমে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনি বাধ্যবাধকতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ব্যক্তিগতভাবে আদালতের আদেশ ছাড়া যেকোনো বক্তব্য প্রচারে বাধা সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। তবে যখন একটি বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার ওপর পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের জন্যই বাধ্যতামূলক। উক্ত আদেশের বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত থাকলে তা আইনানুযায়ী আদালতেই চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ বিদ্যমান রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আদালতের আদেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই।
ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা ও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনগত পদক্ষেপের অগ্রগতি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে উপদেষ্টা বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন গুরুতর মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও পরোয়ানাভুক্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। এর অংশ হিসেবে ভারত সরকারের কাছে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন জানানো হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। সেখানে তিনি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবী নিয়োগসহ সব ধরনের বিচারিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং বিচার বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই সরকার কার্যকর করবে।
বিগত সরকারের শাসনামলে প্রশাসনসহ নানা স্তরে গেড়ে বসা প্রভাবশালীদের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা স্বীকার করেন যে, দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রশাসনিক কাঠামোকে রাতারাতি রূপান্তর করা সম্ভব নয়। গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে হুটহাট কোনো ঢালাও পরিবর্তনের ফলে যেন সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিক সেবা পৌঁছানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয় বা রাষ্ট্রের সেবাদান ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখে সরকার সতর্কতার সাথে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ অব্যাহত রেখেছে।
এ ছাড়া সাবেক পুলিশ প্রধানের জামিন সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে গণমাধ্যম ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তথ্যের সম্ভাব্য সমন্বয়হীনতার প্রশ্ন উঠলে উপদেষ্টা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে খতিয়ে দেখতে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলবেন এবং কেন তথ্যের ক্ষেত্রে এমন ব্যবধান তৈরি হয়েছে তা পর্যালোচনা করে সমাধান করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সার্বিকভাবে দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যেই সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।


