গাইবান্ধায় জামায়াত আমিরের জনসভা: ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

গাইবান্ধায় জামায়াত আমিরের জনসভা: ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি

রাজনীতি ডেস্ক

বর্তমান সরকার জনগণের অধিকার হরণ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রাখলে তাদের পরিণতিও পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকারের মতো হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে দেশ থেকে দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি বন্ধে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো অপচেষ্টা দেশের জনগণ আর বরদাশত করবে না।

সোমবার দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া কাজী আজহার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশালাকার জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জনসভায় উত্তরাঞ্চলের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির কারণে নির্দিষ্ট অঞ্চলকে উন্নয়নবঞ্চিত রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকায় এবং সেখানে বেশি সংখ্যক আসন লাভ করায় দীর্ঘ দিন ধরে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে এই এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। রংপুরের সচেতন জনগণ এই ধরনের বৈষম্যমূলক নীতি কখনোই মেনে নেবে না এবং রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায় করে ছাড়বে।

ক্ষমতাসীনদের অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেন, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অতীতে কোনো শাসক দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাস প্রমাণ করে, জনগণের রায় এবং আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতার মসনদে থাকার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যারা এখনো জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার পথ বেছে নিচ্ছেন, তাদের জন্য পালানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। এ সময় তিনি স্পষ্ট জানান, বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম জনগণ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে কোনো বৈদেশাক শক্তির খবরদারি বা হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।

দেশের তরুণ ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের পথ এখন যুবসমাজই দেখিয়ে দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বর্তমান ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনী রাজনীতি বা গণভোটের ক্ষেত্রে জনগণের সামনে এক ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করা এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা। রাজনৈতিক সততার অভাব এবং সুশাসনের অভাবের কারণে অতীতে অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যারা এখনো গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে টালবাহানা করছেন, তাদের পরিণতিও একই হবে।

প্রশাসনিক ও সামাজিক দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে বর্তমানে নিয়োগ বাণিজ্যকে একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন খাতে চুরি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও চাঁদাবাজি চরমে পৌঁছেছে। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতির বিলোপ সাধন এখন সময়ের দাবি। চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং দেশ পুনর্গঠনের স্বার্থে প্রয়োজন হলে সাধারণ মানুষ শতবার রাজপথে নেমে এসে প্রতিবাদ গড়ে তুলবে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতার লিপ্সা ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে কোনো মায়ের কোল খালি হোক—এমন পরিস্থিতি দেশবাসী আর দেখতে চায় না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিনা উসকানিতে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বক্তব্য প্রদান করেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, বগুড়া জেলা আমির আব্দুল হক, গাইবান্ধা জেলা আমির আব্দুল করিম এমপি এবং গাইবান্ধা জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আল কাজামী।

জনসভায় যোগ দেওয়ার পূর্বে ডা. শফিকুর রহমান বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নিহত স্থানীয় ছাত্রশিবির কর্মী সাইফুল্লাহ বারী এবং জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিনের বাসভবনে যান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং তাদের সহায়তার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে তিনি নিহতদের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।

রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ