৮৬ হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চালু হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা, অর্থ বরাদ্দ ১১০০ কোটি টাকা

৮৬ হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চালু হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতা, অর্থ বরাদ্দ ১১০০ কোটি টাকা

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে দেশের মোট ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অধীনে মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ধর্মীয় নেতা ও উপাসনালয় কর্মী প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে সরকারি ভাতা পাবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন বলে নিশ্চিত করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সোমবার (১০ আগস্ট) ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গঠিত একটি বিশেষ সেলের সাম্প্রতিক সভায় এ সংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা ও রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। সেলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সংসদ সদস্য হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার, ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অর্থসংস্থান ও বরাদ্দের চিত্র:
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে কর্মরত ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানী প্রদানের লক্ষ্যে চলতি বাজেটে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর ফলে দেশের মোট ধর্মীয় উপাসনালয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ চলতি অর্থবছরেই রাষ্ট্রীয় এই সুবিধার আওতায় চলে আসবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরবর্তী তিনটি অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে শতভাগ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সেখানকার কর্মচারীদের এই সম্মানীর আওতায় নিয়ে আসা হবে।

উপাসনালয় ভিত্তিক বিভাজন ও নির্বাচনের মানদণ্ড:
চলতি অর্থবছরে ভাতা পাওয়া ৮৬ হাজার ৭০ ৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ, ৩ হাজারটি মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধ বিহার এবং ৩০১টি গির্জা। ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে নীতি নির্ধারক সেল।

প্রস্তাবিত বিন্যাস অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা থেকে ১৫টি করে মসজিদ নির্বাচন করা হবে। পৌরসভাগুলোর ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে কাঠামোগত ভিন্নতা রাখা হয়েছে—’ক’ শ্রেণির পৌরসভার প্রতি ওয়ার্ড থেকে চারটি, ‘খ’ শ্রেণির প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে তিনটি এবং ‘গ’ শ্রেণির প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে দুইটি করে মসজিদ তালিকাভুক্ত হবে। এ ছাড়া দেশের সকল সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ছয়টি করে মসজিদ এই সুবিধার জন্য মনোনীত হবে।

অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলা থেকে পাঁচটি করে মন্দির নির্ধারিত থাকবে। এর মধ্যে ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা এলাকায় দুটি, অন্য পৌরসভার ক্ষেত্রে একটি এবং অবশিষ্ট মন্দিরগুলো ইউনিয়ন পর্যায় থেকে বাছাই করা হবে। অন্যদিকে, দেশের বৌদ্ধবিহার ও গির্জাগুলোর ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক মোট সংখ্যার ২৫ শতাংশ হারে এই তালিকা প্রস্তুত করা হবে।

ভাতার পরিমাণ ও পরিশোধ পদ্ধতি:
প্রকল্পটির আওতায় পদমর্যাদা অনুযায়ী ধর্মীয় প্রধান এবং সহকারীদের জন্য পৃথক ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিটি মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ এবং গির্জার যাজক প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পাবেন। একইভাবে মসজিদের মুয়াজ্জিন, মন্দিরের সেবাইত, বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ এবং গির্জার সহকারী যাজক পাবেন মাসে ৩ হাজার টাকা। এছাড়া মসজিদের খাদেমদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার টাকা মাসিক সম্মানী।

স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের জটিলতা এড়াতে সম্মানীর অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের স্ব-স্ব ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) পদ্ধতির সাহায্যে প্রতি মাসে এই অর্থ সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।

কার্যক্রমের ব্যাকগ্রাউন্ড ও গুরুত্ব:
বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মচারীদের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে স্থায়ী কল্যাণমূলক কাঠামোর সূচনা ঘটে বিগত অর্থবছরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এর পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে দেশের ৬ হাজার ১৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জন ধর্মীয় কর্মীকে প্রথমবার এই সম্মানীর আওতায় আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের প্রথম মাসেই, ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সেই পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন।

পাইলট প্রকল্পের সফলতার পর চলতি অর্থবছরে এর পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি করা হলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশাল এক জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। সরকারের এই পদক্ষেপে সমাজে তাদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদার সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে কেবল একটি ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীই উপকৃত হচ্ছে না, বরং এটি সার্বিক জাতীয় কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোক আরও সুদৃঢ় করবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ