আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে কৃষি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

জাতীয় ডেস্ক
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশকে পর্যায়ক্রমে কৃষিপণ্য আমদানি নির্ভরতা থেকে মুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সরকার। বিগত ১৮০ দিনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও অর্জিত অগ্রগতিকে সন্তোষজনক উল্লেখ করে নীতিগত ও অবকাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কৌশলগত উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। এ সময় কৃষি সচিব মো. সেলিম খান উপস্থিত ছিলেন।
সার ব্যবস্থাপনার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে কৃষিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই; বরং জাতীয় চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর রাসায়নিক ও জৈব সারের রাষ্ট্রীয় মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন। মাঠপর্যায়ে সরবরাহ শৃঙ্খল নিরবচ্ছিন্ন রাখতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও প্রণোদনা সরাসরি পৌঁছে দিতে ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে প্রায় ১৪ লাখ কৃষকের সমন্বয়ে একটি হালনাগাদ ডেটাবেজ প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি মাসে পর্যায়ক্রমে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ প্রকৃত উৎপাদনকারীর হাতে ‘কৃষক কার্ড’ হস্তান্তর করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি প্রদান, ঋণ সহায়তা এবং কৃষি উপকরণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় বনায়ন ও সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে নেওয়া অবকাঠামোগত লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি তুলে ধরে জানানো হয়, বিগত ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার বিপরীতে ইতোমধ্যে ২৪ লাখ ১৮ হাজারের বেশি চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের বিপরীতে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
মসলা জাতীয় পণ্যের উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা জোরদার প্রসঙ্গে জানানো হয়, আধুনিক ব্যবস্থার কারণে চলতি বছর এখন পর্যন্ত কোনো পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন পড়েনি। পূর্বে উপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে বিপুল পরিমাণ ফসল মাঠেই নষ্ট হতো। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কাজে লাগিয়ে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ গুণগত মান বজায় রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায় ভবিষ্যতে ৩ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
পাশাপাশি পাটবীজ, পেঁয়াজবীজ ও আদার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে পরনির্ভরশীলতা শূন্যে নামিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা মেটাতে কৃষি বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে উন্নত জাত ও ফলনশীল বীজের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্ভাবনী প্রযুক্তির অংশ হিসেবে আগামী বছর থেকে ‘ব্রি ১১৮’ নামের নতুন একটি উচ্চফলনশীল ধানের জাতের মাঠপর্যায়ে চাষাবাদ শুরু হচ্ছে। হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এই জাতটি প্রচলিত জাতগুলোর চেয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন আগে রোপণ ও কর্তন করা সম্ভব হবে। ফলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার হাত থেকে বোরো ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে।
উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের লক্ষ্যে সরকার সেচ ব্যবস্থাপনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ডিজেল ও প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের সেচ পাম্পগুলোকে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইতোমধ্যে ৬০ থেকে ৬২ হাজার পাম্প সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ