অপরাধ ডেস্ক
রাজধানীর পৃথক স্থানে দুই জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের ওপর হামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবির ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা-ওয়ারী বিভাগ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সানি সাহা (৩৮) ও ফাতিন ইসরাক লাবিব (২০)। শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর শনির আখড়া ও নিকুঞ্জ এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডি থানার ৪ নম্বর রোডে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হকের গাড়ির গতিরোধ করে পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি। সে সময় তারা ওই চিকিৎসককে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দেয়।
এর কিছুদিন পর, গত ১৭ আগস্ট রাতে শান্তিনগর এলাকায় দ্বিতীয় হামলার ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে বাসায় ফেরার জন্য বের হন। রাত আনুমানিক পৌনে ১১টার দিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার সময় জীবন ওরফে আদিলসহ কয়েকজন তাঁর পথরোধ করে। গতিরোধের কারণ জানতে চাইলে দুর্বৃত্তরা তাঁকে জোরপূর্বক নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে আদিল ডা. আসাদুর রহমানের ডান চোখে গুরুতর জখম করে এবং অন্য সহযোগীরা তাঁর মাথা ও চোখের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে জখম করে।
ঘটনার সময় স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে পল্টন মডেল থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবন ওরফে আদিলকে হাতেনাতে আটক করে। তবে হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যরা কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ডা. আসাদুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে এ ঘটনায় ডা. মো. আসাদুর রহমান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় জীবন ওরফে আদিলসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, হামলার কিছুদিন আগে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করে তাঁর কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না পেয়েই পরিকল্পিতভাবে তাঁর ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে ঘটনার নেপথ্যে থাকা চক্রটিকে চিহ্নিত করতে ছায়া তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে যাত্রাবাড়ী থানার শনির আখড়া গোয়ালপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সানি সাহাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি-ওয়ারী বিভাগের একটি দল। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত আড়াইটায় খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অভিযান চালিয়ে হামলার জন্য লোক সরবরাহকারী ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সানি সাহা জানান, তিনি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় সিঙ্গাপুরের একটি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার প্রজেক্ট কোম্পানিতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৩ সালে সেখানে জান্নাত আলমগীর হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। একপর্যায়ে আলমগীর হোসেনের প্ররোচনায় মানি লন্ডারিংয়ের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানে প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর অর্থ উদ্ধারের পথ খুঁজতে গিয়ে সানি সাহা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। চলতি বছরের আগস্টের শুরুতে দেশে ফিরে তিনি রাজধানীর ভাটারা এলাকায় জান্নাত আলমগীর হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উচ্চবিত্ত ও পেশাজীবী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য—যেমন বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, দৈনন্দিন চলাচলের রুট ও আর্থিক অবস্থার বিবরণ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় সানিকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমাজের প্রতিষ্ঠিত দুই জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হক ও অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের ছক আঁকা হয়। মাঠে হামলা কার্যকর করতে সদস্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় সহযোগী ফাতিন ইসরাক লাবিবকে। লাবিব ভাড়াটে অপরাধীদের জড়ো করে চিকিৎসকদের ওপর নজরদারি ও শারীরিক আক্রমণ চালায়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং এই চাঁদাবাজ ও অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


