পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই অর্থায়নের মাধ্যমে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের ২৬টি দুর্গম উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হবে। এর ফলে অঞ্চলটির অন্তত ৮৮ হাজার নতুন পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে, যার মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর।
‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট ইন দ্য চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, জরুরি সেবার মান উন্নয়ন এবং সামগ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন জোরদার করা হবে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো দেশের অন্যতম দুর্গম এই অঞ্চলে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের আধুনিকায়ন ও পরিধি বৃদ্ধি করা।
প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, এই অর্থায়নে ৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার সক্ষমতার মোট ছয়টি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া কম বিদ্যুৎ অপচয়কারী কন্ডাক্টর ব্যবহার করে ৫ হাজার ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন বিতরণ লাইন স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পুরোনো ১ হাজার ৮৭৪ কিলোমিটার বিতরণ লাইন, চারটি উপকেন্দ্র, একটি সুইচিং স্টেশন এবং একটি আঞ্চলিক মেরামত কর্মশালা আধুনিকায়ন করা হবে। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কারিগরি ক্ষতি ও পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং সামগ্রিক গ্রিডের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ১৯ হাজার ৩০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যুৎব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে এডিবি’র কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝ্যাং উল্লেখ করেছেন যে, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ কর্মসংস্থান, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটির দুর্যোগ সহনশীলতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকার মানুষ আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি এবং নারীর অংশগ্রহণ সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষের বসবাস, যার অর্ধেকের বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতায়নের হার ৯৯ শতাংশ হলেও এই অঞ্চলে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের আওতা তুলনামূলকভাবে বেশ কম। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাগড়াছড়িতে গ্রিড বিদ্যুতের আওতায় রয়েছে ৪৯ শতাংশ মানুষ, রাঙামাটিতে ৪৩ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৪১ শতাংশ। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের সামগ্রিক আওতা ৬৮ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী করে গ্রিড ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করা হবে।
সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৩০টি সৌরবিদ্যুৎ চালিত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে, যা স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এর নেতৃত্বে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের ব্যবহৃত স্কুল, হাসপাতাল, মন্দির ও ক্লিনিকের মতো অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। স্থানীয় মানুষের আয়ের সুযোগ বাড়াতে অন্তত এক হাজার ব্যক্তিকে জীবিকা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং দুই শতাধিক উদ্যোক্তাকে ব্যবসা বিকাশে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে কর্মসংস্থান ও দুর্যোগ সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা বিষয়ে তিনশ শিক্ষার্থীকে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে।
সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে তিনটি গ্রাহক অভিযোগ কেন্দ্র এবং ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাসহ তিনটি শিশুযত্নকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মীদের গ্রাহকসেবা, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সুরক্ষাব্যবস্থা এবং দুর্যোগ সহনশীল প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এডিবি’র এই ঋণের পাশাপাশি জাপান সরকারের অর্থায়নে এবং এডিবি’র মাধ্যমে পরিচালিত ‘জাপান ফান্ড ফর প্রসপারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ থেকে ২৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের অনুদান দেওয়া হবে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার এই প্রকল্পে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার প্রদান করবে এবং প্রকল্পটির নির্বাহী ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার অর্থায়ন করবে।
অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ