ধর্ম ডেস্ক
ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কাবাঘরের পূর্ব কোণে স্থাপিত হাজরে আসওয়াদ মুসলমানদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার একটি নিদর্শন। হজ ও ওমরাহর তাওয়াফের সময় এই পাথর স্পর্শ বা চুম্বন করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। কিন্তু নবম-দশম শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে উগ্র কারামিতা আন্দোলনের বাহরাইনের শাসক আবু তাহির আল-কারামাতির বাহিনী মক্কায় রক্তক্ষয়ী হামলা চালিয়ে হাজরে আসওয়াদ কাবাঘর থেকে খুলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়, যা দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর পর পুনরায় সসম্মানে ফিরিয়ে আনা হয়।
ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে কারামিতারা ছিল একটি চরমপন্থী ইসমাইলি গোষ্ঠী। বাহরাইন ও পূর্ব আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটি গড়ে তুলে আব্বাসীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান নেতা আবু সাইদ আল-জান্নাবির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আবু তাহির আল-জান্নাবি ক্ষমতায় আসেন এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। আব্বাসীয় খেলাফতের কেন্দ্রীয় দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আবু তাহির আল-কারামাতির বাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হয় এবং পবিত্র মসজিদুল হারামে আক্রমণ চালায়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, সেই হামলায় মক্কায় ব্যাপক রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। কারামিতা বাহিনী শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং মক্কার বিভিন্ন স্থানে লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ঐতিহাসিক সূত্রে বহু মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। এই ভয়াবহ তাণ্ডবের পর কারামিতা নেতা আবু তাহির আল-কারামাতির নির্দেশে পবিত্র কাবাঘর থেকে হাজরে আসওয়াদ খুলে নেওয়া হয় এবং তা তাদের নিয়ন্ত্রিত বাহরাইন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। কারামিতারা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে পাথরটি নিজেদের অঞ্চলে স্থাপন করলেও মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসে এতে কোনো পরিবর্তন আসেনি, কারণ হাজরে আসওয়াদের মর্যাদা কাবার পবিত্রতা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
প্রায় ২৩ বছর ধরে হাজরে আসওয়াদ কারামিতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসলমানদের জন্য তাওয়াফ সম্পন্ন করা অত্যন্ত কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক আলোচনা এবং অর্থনৈতিক সমঝোতার ফলস্বরূপ কারামিতারা পাথরটি ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। দুই যুগ পর হাজরে আসওয়াদ পুনরায় সসম্মানে মক্কার পবিত্র কাবাঘরে যথাস্থানে স্থাপন করা হয়, যা ইসলামি ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।


