আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তিউনিশিয়ায় প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের কড়া সমালোচক ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘আল-কাতিবা’-র প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসফিকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির এক বিচারক। শুক্রবার এক্সপ্রেস এফএম রেডিওর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
তিউনিশিয়ার ন্যাশনাল সিন্ডিকেট অব ইউনেসকো জার্নালিস্টস বা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ইউনিয়ন (এসএনজেটি) জানিয়েছে, শুক্রবার এক্সপ্রেস এফএম রেডিওর একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে যোগ দিতে যাওয়ার প্রাক্কালে পুলিশ ইউসফিকে হেফাজতে নেয়। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক ওয়ালিদ বেন রুমা জানান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তাকে কেবল জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে থানায় নিয়ে যান। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা পরোয়ানা প্রদর্শন করেনি বলে অভিযোগ করেছে এসএনজেটি।
এদিকে তিউনিশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রকাশিত বিচার বিভাগীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচারক মোহাম্মদ ইউসফিকে আটক রাখার আদেশ দিয়েছেন। তবে এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এসএনজেটিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। সাংবাদিকদের এই সংগঠনের দাবি, ইউসফির বিরুদ্ধে আনীত আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মূলত তার সাংবাদিকতা ও আল-কাতিবার সম্পাদকীয় নীতির কারণে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারের দমনপীড়ন ও নীতির সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশের জেরে তাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদ ইউসফির আটকের ঘটনাকে তিউনিশিয়ায় ভিন্নমত দমনের সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ দেশের নির্বাহী ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার পর থেকে দেশটিতে সাংবাদিক এবং সরকারের সমালোচকদের ওপর চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ। ২০২২ সালে একটি বিতর্কিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
চলতি বছরে তিউনিশিয়ায় গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিপূর্বে সাংবাদিক জিয়েদ হেনি, মুরাদ জঘিদি ও বোরহেন বসাইসসহ বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত জুনে সাংবাদিক খাওলা বুক্রিমকে অনুপস্থিতিতে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইউসফির আটকের ঘটনায় তিউনিশিয়ার সাংবাদিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসএনজেটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউসফির গ্রেপ্তার কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং তিউনিসিয়ার জনগণের মুক্ত তথ্য পাওয়ার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের শাসক জাইন আল-আবিদিন বেন আলির পতনের পর তিউনিশিয়ায় মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অভূতপূর্বভাবে প্রসারিত হয়েছিল। ওই গণঅভ্যুত্থান থেকেই পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল। তবে বর্তমান প্রশাসনের আমলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সুরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে বলে অভিযোগ সমালোচকদের।
অন্যদিকে, ভিন্নমত ও স্বাধীন কণ্ঠ দমনের এসব অভিযোগ বরাবরই জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ। তিনি দাবি করেছেন, দেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি কখনো স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হবেন না এবং তিউনিশিয়ায় নাগরিকদের স্বাধীনতা পুরোপুরি সুরক্ষিত রয়েছে বলে তিনি বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন। তবে বিচার বিভাগের মাধ্যমে ইউসফিকে আটকের এই নির্দেশ দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।


