প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরামের সম্মেলনে চীনের আগ্রাসী কূটনীতির তীব্র নিন্দা তাইওয়ানের

প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরামের সম্মেলনে চীনের আগ্রাসী কূটনীতির তীব্র নিন্দা তাইওয়ানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরামের (পিআইএফ) সাম্প্রতিক সম্মেলনে চীনের আক্রমণাত্মক ‘উলফ ওয়ারিয়র’ কূটনীতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে সম্মেলনে সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তি, নজরদারি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তাইপেতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন তাইওয়ানের শীর্ষ এই কূটনীতিক।
চলতি বছরের প্যাসিফিক আইল্যান্ডস ফোরামের সম্মেলনে তাইওয়ানের উপস্থিতি ও অংশীদারত্ব নিয়ে শুরু থেকেই কঠোর বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। চীনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাইওয়ানের এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কোনো বৈধ অধিকার নেই এবং এর অংশ নিলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে। উল্লেখ্য, এবারের সম্মেলনের আয়োজক দেশ পালাউ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হাতে গোনা কয়েকটি স্বাধীন দেশের একটি, যাদের সঙ্গে তাইওয়ানের দীর্ঘদিনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করা বেইজিংয়ের এই আধিপত্যবাদী অবস্থান বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে তাইপের গণতান্ত্রিক সরকার।
সংবাদ সম্মেলনে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং বলেন, চীনের বর্তমান ‘উলফ ওয়ারিয়র’ বা আক্রমণাত্মক কূটনীতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক ঐক্য মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে। বেইজিংয়ের এই আচরণ অত্যন্ত বিরক্তিকর ও আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। তিনি স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, কূটনৈতিক প্রোটোকল অনুযায়ী তাইওয়ান ও চীন উভয় পক্ষই এই ফোরামের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিল। অথচ বেইজিং নানাভাবে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে।
চীনের পক্ষ থেকে জারি করা বিভিন্ন হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করে লিন জানান, আয়োজক দেশ পালাউকে খারাপ পরিণতি ভোগ করার হুমকি দেওয়া কিংবা পালাউকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য ‘ভ্রমণের জন্য অনিরাপদ’ হিসেবে অপপ্রচার চালানো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম উপহাস ও অমর্যাদাকর। এই ধরনের আচরণ আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
সম্মেলন চলাকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সম্মেলনের প্রতিটি ধাপে এবং যেখানেই তাইওয়ানের প্রতিনিধি দল গেছে, সেখানেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাদা পোশাকের কর্মী ও গোয়েন্দা নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহজনক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। মূলত তারা এই আন্তর্জাতিক আসরে স্পষ্ট এবং সুপরিকল্পিত গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল। তবে স্বাগতিক দেশ পালাউ সরকার তাইওয়ানিজ প্রতিনিধিদের সুরক্ষার জন্য যে বিশেষ ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তার জন্য তাইপে সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
এদিকে তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব গুরুতর অভিযোগকে সম্পূর্ণ অলীক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বেইজিংয়ের এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং তাইওয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই এই ধরনের বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব কাল্পনিক অভিযোগ তাইওয়ানিজ কূটনীতিকদের আন্তর্জাতিক মহলে আরও বেশি কোণঠাসা ও হাস্যকর করে তুলবে।
তবে চীনের এসব রক্তচক্ষু ও নানামুখী হুমকিকে কোনোভাবেই পাত্তা দিচ্ছে না তাইপে। তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন যত বেশি আধিপত্য বিস্তার ও আগ্রাসী মনস্তাত্ত্বিক মনোভাব প্রদর্শন করবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মুক্ত বিশ্বের দেশগুলোর কাছ থেকে তাইওয়ানের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন এবং সংহতি ঠিক ততটাই দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাইওয়ানের কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব ও প্রভাব বজায় রাখতে এই ধরনের আঞ্চলিক সম্মেলনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে বেইজিং এবং তাইপের মধ্যকার এই কূটনৈতিক লড়াই আগামী দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যা এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ