মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক মিম্বর ও খেজুরগাছের কান্নার অলৌকিক ইতিহাস

মসজিদে নববীর ঐতিহাসিক মিম্বর ও খেজুরগাছের কান্নার অলৌকিক ইতিহাস

ধর্ম ডেস্ক
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান ও নিদর্শন রয়েছে, যা কেবল স্থাপত্যের নিদর্শন নয়; বরং এগুলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, দাওয়াত এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগের অমূল্য স্মৃতি বহন করে। মদিনার মসজিদে নববীর রাওজা শরিফের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত মহানবী (সা.)-এর মিম্বর তেমনই একটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন। এই মিম্বরের মাধ্যমে মহানবী (সা.) মুসলিম উম্মার উদ্দেশে খুতবা প্রদান করতেন, দ্বিনের মৌলিক শিক্ষা দিতেন এবং সঠিক পথের দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। তবে এই মিম্বরের ইতিহাস ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি খেজুরগাছের গুঁড়ির কান্নার ঘটনা ইসলামী ঐতিহ্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও আবেগঘন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে মসজিদে নববীতে কোনো নির্দিষ্ট মিম্বর ছিল না। খুতবা দেওয়ার সময় মহানবী (সা.) খেজুরগাছের একটি শুকনো গুঁড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতেন। সাহাবায়ে কেরাম সেই অবস্থাতেই তাঁর কাছ থেকে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও দ্বিনের বিভিন্ন নির্দেশনা গ্রহণ করতেন। পরবর্তী সময়ে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে এবং প্রবীণ ও নবীন সাহাবিদের সবার সুবিধার্থে মহানবী (সা.)-এর জন্য একটি বিশেষ মিম্বর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরপর দুজন বা তিনজন ধাপবিশিষ্ট একটি কাঠের মিম্বর তৈরি করা হয়।
হাদিসের প্রামাণিক বর্ণনা অনুযায়ী, মিম্বরটি প্রস্তুত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাতে খুতবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলেন, তখন সেই পুরনো খেজুরগাছের গুঁড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। ঘটনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল এবং মসজিদে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামও সেই কান্নার শব্দ পরিষ্কার শুনতে পেয়েছিলেন। এই অলৌকিক ঘটনায় সে সময় উপস্থিত সাহাবিদের মধ্যে গভীর আবেগ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়।
সহিহ হাদিসে এই ঘটনার সত্যতা জোরালোভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত সাহল ইবন সাদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর জন্য যখন মিম্বর তৈরি করা হলো এবং তিনি তাতে উঠলেন, তখন পূর্বে যে খেজুরগাছের গুঁড়িতে তিনি হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন, সেটি একটি শিশুর মতো কান্নার শব্দ করতে লাগল। পরে মহানবী (সা.) মিম্বর থেকে নিচে নেমে এসে সেটির ওপর নিজের মোবারক হাত রাখলেন, যার ফলে সেটি শান্ত হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৮৪)। আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) গুঁড়িটিকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে, যদি একে জড়িয়ে ধরা না হতো, তবে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত এটি কাঁদতে থাকত।
বর্তমান সময়ে মদিনায় আগত বিশ্বজুড়ে লাখো মুসলিমের কাছে পবিত্র মসজিদে নববী ও এর আশপাশের প্রতিটি প্রাঙ্গণ গভীর আবেগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। এখানকার প্রতিটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপত্য মহানবী (সা.)-এর সোনালী যুগের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়। মহানবী (সা.)-এর মিম্বর সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অক্ষুণ্ণ স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খেজুরগাছের গুঁড়ির কান্নার এই ঘটনাটি কেবল একটি অলৌকিক নিদর্শনই নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম উম্মার হৃদয়ে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। একটি জড় বস্তুর এমন আকুলতা মুমিন হৃদয়ে নবীপ্রেমের গভীরতা ও গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধির সুযোগ তৈরি করে দেয়।
ধর্ম শীর্ষ সংবাদ