ধর্ম ডেস্ক
মানুষের জীবনের অন্যতম বড় এবং ধ্রুব চিন্তা হলো রিজিক। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে প্রয়োজন পূরণ হবে এবং ভবিষ্যৎ কী রূপ নেবে—এসব ভাবনা প্রায়শই মানুষের মনে অস্থিরতা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। অথচ ইসলামী জীবনদর্শন অনুযায়ী, রিজিকের প্রকৃত মালিক কোনো মানুষ বা পার্থিব শক্তি নয়, বরং এর একমাত্র নিয়ন্ত্রক মহান আল্লাহ তাআলা। তিনি প্রতিটি বান্দার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ রিজিক অবধারিত করে রেখেছেন, যা কোনো শক্তির পক্ষেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে ইসলামে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখার পাশাপাশি হালাল উপায়ে রিজিক অন্বেষণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই দুইয়ের সুষম সমন্বয়ই একজন মুমিনের জীবনের প্রকৃত ভারসাম্য রক্ষা করে। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সম্পদ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের ফসল। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিকদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৮)।
ইসলামী নীতিমালায় রিজিক বৃদ্ধির বেশ কিছু কার্যকর ও আধ্যাত্মিক উপায়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অন্যতম। যিনি আল্লাহকে ভয় করে চলেন এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন যাপন করেন, তার জন্য আল্লাহ অপ্রত্যাশিতভাবে রিজিকের পথ খুলে দেন। সুরা তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ এই নির্দেশনা মুমিনের জন্য গভীর আশ্বাসের প্রতীক। সংকটের মুহূর্তে শুধু পার্থিব আয় বাড়ানোর হিসাব নয়, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
একই সঙ্গে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা করার প্রকৃত অর্থ কর্মবিমুখতা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে পাখিদের উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সকালে খালি পেটে বেরিয়ে যেভাবে পাখিরা সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে, তেমনি চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। অন্তরের বিশ্বাস হবে আল্লাহর ওপর, আর শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঞ্জের মাধ্যমে চলতে হবে কর্মতৎপরতা। এ ছাড়া নিয়মিত দোয়া এবং ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা রিজিকের দরজা উন্মুক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সুরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে ইস্তিগফারের তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধি দান করবেন।
ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্কও রিজিকের বরকতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আয়ু ও রিজিক প্রশস্ত করার অন্যতম মাধ্যম বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে দান বা সদকা করার মাধ্যমে সম্পদ কমে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বহুগুণ প্রতিদান ও বরকত নিশ্চিত হয়। দিনের শুরুতে কর্মচাঞ্চল্য এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারও রিজিক অন্বেষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি একটি অভ্যাস।
তবে সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো উপার্জনের মাধ্যম যেন সম্পূর্ণরূপে হালাল হয়। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি বা অবৈধ পন্থায় অর্জিত সম্পদ সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা দুনিয়া ও আখিরাতে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে রিজিক কেবল ব্যাংক-ব্যালেন্স বা নগদ অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুস্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, নেক সন্তান, ভালো পরিবার, ঈমান, জ্ঞান এবং আল্লাহর ইবাদতের তাওফিক—এ সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। তাই পার্থিব সংকট মোকাবিলায় কেবল গতানুগতিক হিসাব-নিকাশ নয়, বরং সামগ্রিক জীবনাচরণে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলা এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা অপরিহার্য।


