অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকার বেশি বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রবিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদীয় অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনে সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ দেশের সাধারণ জনগণের মাথাপিছু ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ঋণের বোঝা লাঘবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী দেশের জনমিতি ও মোট ঋণের পরিমাণ বিবেচনা করে মাথাপিছু ঋণের এই হিসাব দাঁড়ায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ দশমিক ১৯ টাকা। ক্রমবর্ধমান উন্নয়নে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করে থাকে, যা জনসংখ্যার অনুপাতে এই মাথাপিছু হিসেবে প্রতিফলিত হয়।
জাতীয় অর্থনীতিতে ঋণের চাপ কমাতে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন, এবং সরকারি তহবিলের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল ও টেকসই করতে মধ্যমেয়াদি কৌশলগত রূপরেখা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে সংসদকে অবহিত করা হয়।
এদিকে, বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ব্যাংকিং খাতের এই উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও তারল্য প্রবাহের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
অর্থমন্ত্রী গত ৩০ জুনের হালনাগাদ হিসাব তুলে ধরে জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংক পিএলসিতে। ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংক পিএলসির ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
বিশেষায়িত ও অন্যান্য খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি বা বিডিবিএল-এর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং বেসিক ব্যাংক পিএলসির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আটকে থাকায় মূলধন ঘাটতি এবং ঋণ বিতরণে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে, যা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
ব্যাংকিং খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট উত্তরণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করা, ঋণ গ্রহণে কঠোর নিয়ম নীতি প্রয়োগ এবং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহлийн মতে, ঋণ শৃঙ্খলার সঠিক বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিকে যেমন মাথাপিছু ঋণের প্রকৃত চাপ কমানো সম্ভব, তেমনি খেলাপি সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে আর্থিক খাতের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাবে।


