ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ঐতিহাসিক মোড় এসেছে। দশকের পর দশক ধরে চলা বিচারহীনতার প্রাচীরে এবার ফাটল ধরেছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ব্রিটেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পররাষ্ট্র সচিব এড মিলিব্যান্ডের ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে একটি বাঁকবদল।
তিনি ঘোষণা করেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতির সঙ্গে সমস্ত বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হবে এবং ইসরায়েলের পুরো দখলদারিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অবৈধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছিল। এবার ব্রিটেন নিন্দা থেকে পদক্ষেপের দিকে গেল।
পার্লামেন্টে মিলিব্যান্ডের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত কঠোর:
“So I can announce today that we will introduce an import ban on goods from illegal settlements in the occupied territories,”
এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকছে তিনটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ:
ক) অবৈধ বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা: দখলকৃত পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা বসতিগুলো থেকে আসা পণ্যের আমদানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।
খ) ডাবল লক নীতি: দখলদারিত্বে সহায়তা করে এমন কোনো সামরিক ও যুদ্ধ সরঞ্জাম রপ্তানির লাইসেন্স না দেওয়া। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষায়, “if you are a British citizen or business, you should not conduct any economic and financial activities in illegal Israeli settlements”
গ) দখলদারিত্বের অবৈধতার স্বীকৃতি: ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ) রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে ব্রিটেন প্রথমবারের মতো বলেছে যে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা কার্যত অন্যায়কারীর পক্ষ নেওয়ারই নামান্তর। ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বিশ্ব বিবেক জেগে ওঠে। এই জাগরণকে ভিত্তি করেই ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের একসুরে সোচ্চার থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর মূল্যায়ন। তিনি পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তাকে সরাসরি “ethnic cleansing” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, এই পদক্ষেপগুলো “ethnic cleansing in the West Bank”-এর শামিল।
তাঁর এই বক্তব্যের সময় পাশে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম, যিনি বলেন, ব্রিটেন “continue to act in support of our values”।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হুসাম জমলট এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে যথার্থই বলেছেন, “আজ ব্রিটেন নিন্দা থেকে পরিণত ফলাফলের দিকে, শব্দ থেকে কাজের দিকে এগোতে শুরু করেছে।”
ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক জাগরণের অংশ।
ব্রিটেনের সঙ্গে ফ্রান্স ও কানাডা যৌথভাবে এই নিষেধাজ্ঞায় যোগ দিয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, “UK, France among 12 states backing sanctions on illegal Israeli settlements.”
যৌথ বিবৃতিতে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেনও একই পথে হাঁটার অঙ্গীকার করেছে। এই দেশগুলো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—দখলদারিত্ব ও সহিংসতা আর কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আল-জাজিরার বিশ্লেষক যেমন বলেছেন, এটি “strongest condemnation ever issued by the UK government on Israeli occupation”।
এই পরিবর্তনকে ব্রিটেনের মানবতাকামী মানুষ প্রথম ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানাবেই। কিন্তু গাজায় প্রতিদিন শিশু, নারী ও নিরীহ মানুষের ওপর যে বর্বর হত্যাযজ্ঞ ও জাতিগত নিধন চলছে, তা কেবল আংশিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায় থামবে না।
তাই বিশ্ব বিবেকের কাছে কয়েকটি আহ্বান করা যায়—
ক) পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা: দখলদারদের হাতে অস্ত্র, অর্থায়ন ও কৌশলগত সহযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। “We believe that violent settler groups should not be profiting from the land that they have seized”—এই নীতিকে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞায় রূপ দিতে হবে।
খ) আন্তর্জাতিক আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ: জাতিসংঘের প্রস্তাব ও ICJ-এর নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের একযোগে সোচ্চার হতে হবে। অপরাধীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দাঁড় করাতে হবে।
গ) দ্বিমুখী নীতির অবসান: ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রক্তপাত বন্ধ হোক, জয় হোক সত্য ও মানবতার।

