২৮ বছর বয়সী রাইড শেয়ারিং চালক আমিনুল ইসলাম সপ্তাহে মোবাইল ফোনে ১৫০–২০০ টাকা রিচার্জ করেন। স্পেকট্রাম নবায়ন ফি, ভ্যাট কিংবা সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তিনি ভাবেন না। তিনি শুধু দেখছেন, মোবাইল ডেটার খরচ দিন দিন বাড়ছে এবং ব্যস্ত সময়ে নিয়মিত নেটওয়ার্কে সমস্যা হচ্ছে—অথচ তার দৈনিক আয় রয়ে যাচ্ছে একই।
আমিনুল বলেন, "প্রতি মাসেই মনে হয়, একই দামের ডেটা প্যাকেজে আগের চেয়ে কম জিবি পাচ্ছি। যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে সরাসরি আমার আয়ে প্রভাব পড়ে। প্রযুক্তি উন্নয়নের কথা আমরা শুনি, কিন্তু রাস্তায় এখনো ইন্টারনেটের গতি ও নির্ভরযোগ্যতায় ঘাটতি রয়েছে।"
আমিনুলের এই অভিজ্ঞতায় টেলিযোগাযোগ খাতের একটি বড় সমস্যার প্রভাব সাধারণ গ্রাহকের ওপর কীভাবে পড়ছে, তা উঠে এসেছে। আগামী নভেম্বরে তিনটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটরের মোট ৭৯.২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের মেয়াদ শেষ হবে। এগুলো নবায়ন করতে হবে অপারেটরদের। এতে সরকারের কোষাগারে কয়েক হাজার কোটি টাকা আসতে পারে। তবে বর্তমানে ব্যবহার করা এসব স্পেকট্রাম ধরে রাখতেই অপারেটরদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি সামনে এসেছে। মোবাইল অপারেটরদের দাবি, বাংলাদেশে স্পেকট্রামের দাম আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশিগুলোর মধ্যে রয়েছে। এই উচ্চ ব্যয়ের কারণে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে। তুলনামূলক ছোট অপারেটরগুলোর ওপর এর চাপ আরও বেশি। অন্যদিকে সরকার স্পেকট্রামকে সীমিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং করবহির্ভূত রাজস্বের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখে।
গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিএসএম অ্যাসোসিয়েশনের (জিএসএমএ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উত্থাপিত উচ্চ ব্যয়ের উদ্বেগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বীকার করলেও তাদের বক্তব্য, স্পেকট্রামের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণে সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
৭০০ মেগাহার্টজ নিলামে মূল্য নির্ধারণের সংকট
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিলামের পর এ নিয়ে টানাপোড়েন আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নিলামে ২০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম তোলে। গ্রামীণফোন প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকা ভিত্তিমূল্যে ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম কিনে নেয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় হয় ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। নিলাম ও অতিরিক্ত মূল্য নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক এতে অংশ নেয়নি।
অবশিষ্ট ১০ মেগাহার্টজ পরে একই হারে, অর্থাৎ প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটককে বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্পেকট্রামসহ অন্যান্য খাতে অপারেটরটির বকেয়া থাকা সত্ত্বেও এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের পর প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ থাকা নিয়ে প্রশ্ন তলে বেসরকারি অপারেটরগুলো।
অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, আসন্ন স্পেকট্রাম নবায়নের পরিমাণ অনেক বড় এবং এর ব্যয় বহন করা অপারেটরদের জন্য কঠিন হবে।
নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা বজায় রাখতে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণে বিটিআরসির প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্পেকট্রামের মূল্য বনাম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটরগুলো বর্তমানে সারা দেশে মোট ৪৬৩ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ৪০৬.৬ মেগাহার্টজ কোর ব্যান্ড এবং ৫৭.০ মেগাহার্টজ বিশেষায়িত এক্সটেনশন।
বর্তমানে গ্রামীণফোনের ৮ কোটি ৪৪ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ১৩৭.৪ মেগাহার্টজ, রবির ৫ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ১২৪ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহকের বিপরীতে ৮০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের হাতে রয়েছে ৬৫.২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম, যার গ্রাহক প্রায় ৬৮ লাখ।
আগামী নভেম্বরে নবায়নের অপেক্ষায় থাকা মোট ৭৯.২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের মধ্যে গ্রামীণফোনকে ৩২.৪ মেগাহার্টজ, রবিকে ২২.৪ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংককে ২৪.৪ মেগাহার্টজ নবায়ন করতে হবে।
অপারেটরদের দাবি, স্পেকট্রাম ফি বেশি হলে বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) সম্প্রসারণ, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও ফাইবারাইজেশনে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন কমে যায়। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সক্ষমতা ও গতি বাড়ানো হয় এবং উচ্চ ডেটা চাহিদা, ফাইভজি চালু ও কম ল্যাটেন্সির সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী ব্যাকহল সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
শিল্প খাতের একটি মূল্যায়ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাজারের আকার ও কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব করলে বাংলাদেশে স্পেকট্রামের দাম নর্ডিক দেশগুলোর তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ বেশি।
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে সীমিত স্পেকট্রাম নিয়েও তারা দ্রুত বাড়তে থাকা ডেটার চাহিদা সামাল দিয়েছেন।
আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রামের ব্যয় বেশি
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রামের ঘোষিত মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড, নিলাম পদ্ধতি, লাইসেন্সের মেয়াদ ও অর্থ পরিশোধের শর্তে পার্থক্য থাকায় দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
২০২২ সালের নিলামে বাংলাদেশে ২.৩ গিগাহার্টজ ও ২.৬ গিগাহার্টজ স্পেকট্রামের দাম ছিল প্রতি মেগাহার্টজ প্রায় ৬০ লাখ ডলার। সেই তুলনায় ভারতে ৩.৩ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের দাম ছিল প্রতি মেগাহার্টজ প্রায় ১৮–২১ লাখ ডলার এবং পাকিস্তানে ২.৩ ও ২.৬ গিগাহার্টজ স্পেকট্রামের দাম ছিল প্রায় ১০–১২.৫ লাখ ডলার। ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কাতেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যান্ডে এর চেয়ে কম দাম দেখা গেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের অপারেটরদের আয়ের তুলনায় স্পেকট্রামের ব্যয় অনেক বেশি।
জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অপারেটরদের নিয়মিত আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ স্পেকট্রাম ফি বাবদ ব্যয় হয়। এ হার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ১০ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাপী ৮ শতাংশ। অন্যান্য লেভি ও কর যুক্ত করলে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ বাজারের মোট রাজস্বের ওপর সামগ্রিক আর্থিক বোঝা প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়।
জিএসএমএ মোবাইল অপারেটর ও মোবাইল ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। আর এর গবেষণা শাখা জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্স টেলিযোগাযোগ বাজার, স্পেকট্রাম, বিনিয়োগ ও সংযোগ নিয়ে বিশ্লেষণ করে থাকে।
জিএসএমএর পৃথক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে অপারেটরদের আয়ের তুলনায় স্পেকট্রাম ব্যয়ের অনুপাত ২০১৪ সালের ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অনুপাত ১০ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে নেটওয়ার্ক কভারেজ ৬ শতাংশ পয়েন্ট এবং নেটওয়ার্কের গতি ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এ সম্পর্ক থেকে একটির কারণে অন্যটি ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তারপরও এ ফলাফল দেখায়, স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণ এখন শুধু সরকারের রাজস্বের উৎস নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
কর ও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্পেকট্রাম নিলাম ও নবায়ন থেকে পাওয়া করবহির্ভূত রাজস্ব সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের প্রচেষ্টার একটি অংশ।
বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যের আওতায় সামগ্রিক রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচ থেকে বাড়িয়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে ১০.৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তা বলেন, "স্পেকট্রাম একটি সীমিত জাতীয় সম্পদ, যার মালিক জনগণ।"
তিনি বলেন, "আমরা বুঝতে পারি, এ খাতে বিনিয়োগের জন্য মূলধন প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে সরকারি অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অর্থায়নেরও জরুরি প্রয়োজন রয়েছে সরকারের।"

