রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য বৈঠক শুরু ৮ অক্টোবর

রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নানামুখী বিধিনিষেধের মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেড (জেডব্লিউজি)-এর ১৬তম বৈঠক।

আগামী ৮ ও ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা অপসারণ, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক করা এবং বাংলাদেশি পাটপণ্যে আরোপিত ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়গুলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য বৈঠকে যোগ দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল ৭ অক্টোবর ঢাকা থেকে নয়াদিল্লি রওনা হবে।

বৈঠকের সার্বিক প্রস্তুতি ও লক্ষ্য সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, 'দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং সার্বিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের কার্যকর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।' তিনি আরও জানান, বাংলাদেশি পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক আরোপ এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে বাংলাদেশের বিধিনিষেধের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। মূলত সামগ্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ও গতিশীল করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লি যাচ্ছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই দেশের বাণিজ্য স্তরের সর্বশেষ ১৫তম বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। এর আগে ১৪তম বৈঠকটি ২০২২ সালের ২ ও ৩ মার্চ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা তৈরি হয়, যার ফলে নিয়মিত এই বার্ষিক বৈঠকটি নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য ও বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগের বৈঠকগুলোতে মূলত দুই দেশের স্থলবন্দর ও ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টের (আইসিপি) অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বন্দর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট (বর্ডার হাাট) পুনরায় চালু, রেলপথে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, পণ্যের মানদণ্ডের সমন্বয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতি (এমআরএ) নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি ও যৌথ সমীক্ষা, বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্ট ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার বিষয়গুলোও বিগত বৈঠকগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনা থমকে যায় এবং বাণিজ্য সম্পর্কেও অবনতি দৃশ্যমান হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ সরকার বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানির সুবিধা বন্ধ করে দেয়; যদিও সমুদ্রপথে তা আমদানির সুযোগ বহাল রাখা হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারতও বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্য স্থলপথে আমদানির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরবর্তীতে ওই বছরের জুনে পাট ও নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্রপণ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ জারি করা হয়।

দুই দেশের এই টানা-পোড়েন ও বিধিনিষেধের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোলের রপ্তানি চিত্রে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ টনে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ টন।

অবশ্য বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যের গতি পুরোপুরি থামেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি আগের বছরের ৯.৬২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১.৭৬ বিলিয়ন ডলার।

সম্প্রতি বাণিজ্য সংক্রান্ত জটিলতা আরও বৃদ্ধি পায় ভারতের নতুন কিছু শুল্ক নীতিতে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা জুট ইয়ার্ন বা টুইন, হেসিয়ান ফ্যাব্রিক, জুট স্যাকিং ব্যাগ ও ক্লথের ওপর সংশোধিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বাংলাদেশি জুট ইয়ার্ন বা টুইনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি নতুন কোনো তদন্তের ভিত্তিতে নয়, বরং আগের শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনার (ইনটেরিম রিভিউ) অংশ হিসেবে করা হয়েছে।

এ ছাড়া, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য প্রতিকার অধিদপ্তর (ডিজিটিআর) বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশ থেকে আমদানি করা পিইটি ফিল্মের ওপর প্রতি টনে সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার এবং আকিজ বায়াক্স ফিল্মসের ক্ষেত্রে ৫৮ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে। তবে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না।

উল্লেখ্য, ভারত হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি উৎস। বাংলাদেশের শিল্প খাতের কাঁচামাল হিসেবে তুলা, সুতা ও কাপড়ের বড় একটি অংশ ভারত থেকে আসে। প্রতিযোগিতামূলক দর এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সুনির্দিষ্ট উৎসের পণ্য ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার কারণে স্থানীয় শিল্পে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

পরিস্থিতি উত্তরণে দ্বি-পাক্ষিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত আগস্টে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বন্ধ থাকা সীমান্ত হাট চালু, স্থলবন্দরগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং ভারতীয় সুতা আমদানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়ে জোর আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বীকার করেন যে, 'গত দেড় বছরে তৈরি হওয়া নানামুখী বাধা ও জটিলতায় দুই দেশের বাণিজ্য গতি হারিয়েছে।'

নয়াদিল্লি বৈঠকের এজেন্ডা নির্ধারণে গত মে মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে মতামত সংগ্রহ করে। ব্যবসায়ী নেতারা স্থলবন্দরের বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, অশুল্ক বাধা দূরীকরণ এবং পূর্বে বাতিল হওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালুর সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার তুলশিদাস বাধে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। সেখানে তিনি শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের যৌথ সমন্বয়ে একটি 'যৌথ বি-টু-বি টাস্কফোর্স' গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন।

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

জাতীয়