২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক আমদানি কমলেও, এশিয়ার প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার ছিল অনেকটাই কম।
মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৪২ শতাংশ কমে ৪,৯০৮ কোটি (৪৯.০৮ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি ৪.৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩৯ কোটি (৫.৩৯ বিলিয়ন) ডলারে।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমার এই হার চীন ও ভারতের তুলনায় বেশ কম। আলোচ্য সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীন ও ভারতের পোশাক রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ২৯.৩৯ শতাংশ এবং ২৬.৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কমেছে ৩.৮৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের কমেছে ০.৭৬ শতাংশ।
এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে ৬.৯১ শতাংশ এবং ২.৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
তৈরি পোশাকের সামগ্রিক বাজারে মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তুলনামূলক কম পতনকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন এফবিসিসিআই-এর প্রশাসক ও বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক পোশাক আমদানি প্রভাবিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক দিক হলো—আমাদের প্রধান প্রতিযোগীদের তুলনায় রপ্তানি কমার হার বেশ কম।।"
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি পারফরম্যান্স এখন উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং নতুন কার্যাদেশও (অর্ডার) ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, "আমরা এখন ইতিবাচক ধারার দিকেই এগোচ্ছি।"
শুল্ক সুবিধায় ইতিবাচক অবস্থানে বাংলাদেশ
বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, মার্কিন বাজারে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জন্য অনুকূল শুল্ক কাঠামো—দেশের তৈরি পোশাক খাতের এই ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, "চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সাথে শুল্কের যে বড় তফাত রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পণ্য কেনার (সোর্সিং) সিদ্ধান্ত নেওয়াকে প্রভাবিত করছে। আমাদের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্ক কাঠামো ভালো অবস্থানে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি ক্রেতারা এই সুবিধার সুযোগ নিতে চাইবেন।"
রুবেল আরও বলেন, উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি এবং কৃত্রিম তন্তুর (ম্যান-মেড ফাইবার) দিয়ে প্রস্তুতকৃত পোশাকের উৎপাদন বাড়াতে পারলে, বাংলাদেশ এই বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও জোরদার করতে পারবে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা ও পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন ভারত ও পাকিস্তানকে টেক্কা দিয়ে বাজারে টিকে থাকতে সহায়তা করছে।
তিনি বলেন, "এখানে আমাদের মূল সুবিধা হলো শুল্ক কাঠামো; আর দুর্বলতা হলো পণ্য সরবরাহের দীর্ঘ সময় (লিড টাইম) এবং কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।"
শোভন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো পারফর্ম করছে এবং ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার সমপর্যায়ে রয়েছে; কিন্তু ভিয়েতনামের চেয়ে এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কম লিড টাইম এবং কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি উচ্চমূল্যের স্পোর্টস বা অ্যাথলেটিক পোশাক উৎপাদনে তাদের পারদর্শিতা—যে ধরনের পোশাকের চাহিদা এখন মার্কিন বাজারে ক্রমেই বাড়ছে।
বড় সুযোগ কাজে লাগাতে মূল চাবিকাঠি পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন
ওটেক্সার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে স্কয়ার মিটার সমতুল্য (এসএমই) হিসাবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ২.৭৫ শতাংশ, এবং গড়ে প্রতি একক পোশাকের দাম (ইউনিট প্রাইজ) কমেছে ১.৭৩ শতাংশ।
আলোচ্য সময়ে চীন ও ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ কমেছে যথাক্রমে ২১.৬১ শতাংশ এবং ২৪.৯১ শতাংশ। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি কমার হার ছিল ০.১৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ০.২৭ শতাংশ। তবে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ যথাক্রমে ৭.১৮ শতাংশ এবং ৮.৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
দামের দিক থেকে বাংলাদেশি পোশাকের গড় একক মূল্য যেখানে ১.৭৩ শতাংশ কমেছে, সেখানে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ হার কমেছে ০.৫৮ শতাংশ, চীনের ৯.৯৩ শতাংশ এবং ভারতের ২.০৪ শতাংশ। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার পোশাকের গড় দামও একই সময়ে কমেছে।
যদিও এশিয়ার প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর পোশাকের দাম কমেছে, তবুও মার্কিন বাজারে আমদানিকৃত সামগ্রিক পোশাকের গড় একক মূল্য ১.৭১ শতাংশ বেড়েছে।
শোভন ইসলাম বলেন, মার্কিন বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সুযোগ নিতে বাংলাদেশকে এখন অবশ্যই উচ্চমূল্যের পোশাক এবং কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদন বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, মার্কিন বাজারে চীনের হিস্যা কমতে থাকায়– চীনা শিল্পোদ্যোক্তারা এখন ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় তাঁদের কারখানা স্থানান্তরিত করছেন; অথচ বাংলাদেশের সামনেও এই ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিশাল সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা এখনও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী, কিন্তু রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা, জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে সেই বিনিয়োগের গতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শোভন ইসলাম জানান, এর আগে বাংলাদেশে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে প্রায় ২৫০টি চীনা বিনিয়োগ এসেছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে সেই গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে।
আগস্টের ঘুরে দাঁড়ানো জোগাচ্ছে স্বস্তি
এদিকে ৮ মাসের সামগ্রিক হিসাব মন্থর হলেও, গত আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আশাব্যঞ্জক উল্লম্ফন দেখা গেছে। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস কর্তৃক সংকলিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-র তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে এই রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫.৬৫ শতাংশ বেড়ে ৮১.৭ কোটি (৮১৭ মিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে।
একই তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ১৬১ কোটি (১.৬১ বিলিয়ন) ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১১.৪২ শতাংশ বেশি।
বছরের প্রথমার্ধের কঠিন পরিস্থিতির পর আগস্টের এই প্রবৃদ্ধি একটি ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে মন্তব্য করে শোভন ইসলাম বলেন, তবে কেবল শুল্ক সুবিধার ওপর ভরসা না করে—দীর্ঘমেয়াদী সোর্সিং সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই প্রবৃদ্ধির ধারা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
ভিয়েতনামের তুলনামূলকভাবে দৃঢ় স্থিতিস্থাপকতা এবং কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাজার সম্প্রসারণের মাঝেও বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে নিজের জায়গা শক্ত করে ধরে রাখতে পেরেছে। তবে কেবল শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর না করে, সামগ্রিক প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে পারলেই—মার্কিন বাজারের আরও বড় হিস্যা দখল করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব হবে।

