শিক্ষা ও শিশু বিষয়ক ডেস্ক
ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে নিরাপদ, দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে না রেখে, বরং এর সঠিক ব্যবহার শেখানোর মাধ্যমেই তাদের ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী করে তুলতে হবে।
মঙ্গলবার ঢাকার গুলশানে হোটেল লেকশোরে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন আয়োজিত ‘ডিজিটাল জেন্ডার নরমস: জাতীয় শিখন-অভিজ্ঞতা বিনিময়’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ওই সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ রেখে জনগণের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালানো হলেও তা সফল হয়নি। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা পুনরায় প্রমাণ করেছে যে, ডিজিটাল মাধ্যম আজ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিকে অস্বীকার না করে এর সঠিক ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জনই বর্তমান সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সমাজের প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই অসামঞ্জস্য দূর করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের নিরাপদ ডিজিটাল আচরণবিধি, তথ্য যাচাইয়ের কৌশল এবং অনলাইন নৈতিকতা সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া আবশ্যক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়ানো, চরিত্রহনন এবং সাইবার হয়রানি বর্তমানে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এর শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন নারী, কিশোরী এবং নারী রাজনীতিবিদরা। তাই ডিজিটাল পরিসরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষা রক্ষায় কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রয়োগের সময় এসেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা নয়, বরং ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণের পক্ষেও মত দেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও নতুন কারিকুলাম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা বা ভ্যালু-বেইজড এডুকেশন, ডিজিটাল নিরাপত্তা, জীবনদক্ষতা, জেন্ডার সংবেদনশীলতা এবং নাগরিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত করছে। এই রূপকল্প বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে। নতুন শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার আওতায় আনতে ধাপে ধাপে শ্রেণিকক্ষে ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে শিক্ষকদের জন্য ট্যাব প্রদান করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব ডিজিটাল ডিভাইস সরবরাহের পরিকল্পনাও বিবেচনাধীন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের নিরাপদ মানসিক ও শারীরিক বিকাশ কেবল অভিভাবকদের একক দায়িত্ব নয়, বরং এটি পুরো সমাজের যৌথ দায়িত্ব। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমিউনিটি বা স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। স্কুল মিল কার্যক্রমের সুষ্ঠু তদারকির জন্য ইতোমধ্যে গার্ডিয়ান কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং শিক্ষা খাতের অন্যান্য কার্যক্রমেও অভিভাবক ও স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যে সকল উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রমাণিত হবে, সরকার তা সাদরে গ্রহণ ও সম্প্রসারণ করতে প্রস্তুত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘ওপেন-ডোর’ নীতিতে কাজ করছে। ফলপ্রসূ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসলে সরকার তা মূল্যায়ন করে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন করবে।
নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক স্লোগান যথেষ্ট নয়; বরং শৈশব থেকেই সমান সুযোগ, অধিকার, নিরাপদ পরিবেশ এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এই সামাজিক পরিবর্তনের মূল ভিত্তি রচিত হতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা থেকেই।
অনুষ্ঠানে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা ছাড়াও খুলনা ও সাভার অঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ইউএন উইমেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, জাগো ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


