ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারে মন্দাভাব এবং সাম্প্রতিক নানা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের বহু কৃষক যথাসময়ে তাঁদের নেওয়া কৃষিঋণ পরিশোধ করতে পারেন না। ফলে একদিকে যেমন অনাদায়ী ঋণের বোঝা কৃষকের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলছিল, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়মে নতুন করে ঋণ পাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এই সংকট নিরসনে এবং বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কৃষিবান্ধব নীতির আওতায় সারা দেশে অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ সম্পূর্ণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে সর্ববৃহৎ কৃষিঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) সফলভাবে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে।

মঙ্গলবার ব্যাংকটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মওকুফ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মোট ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের বকেয়া ঋণ আনুষ্ঠানিকভাবে মওকুফ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকদের মোট ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ ৮ হাজার ৬৬৭ টাকার সুদে-আসলে পুঞ্জীভূত ঋণের ভার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, সরকার কর্তৃক ঘোষিত দেশব্যাপী মোট মওকুফকৃত অর্থের প্রায় ৩৯ শতাংশ একা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকই পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করেছে।

এই বিশাল পরিসরের কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের দিকনির্দেশনায় বিভাগীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা শাখাগুলোর মাধ্যমে প্রতিটি হিসাবের সঠিক তথ্য যাচাই, নথিপত্র পুনঃপরীক্ষণ এবং চূড়ান্ত হিসাব সমন্বয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে উপযুক্ত কৃষকদের সরাসরি এই সুবিধার আওতায় আনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলন্ত থাকা ছোট অঙ্কের এই অনাদায়ী ঋণগুলো নিষ্পত্তির ফলে ব্যাংকের অকার্যকর ঋণের হার হ্রাসের পাশাপাশি সার্বিক হিসাব ব্যবস্থাপনাও স্বচ্ছ হয়েছে।

বাংলাদেশে সমন্বিত ও একক ব্যাংক হিসেবে মোট বিতরণকৃত মোট কৃষিঋণের ৬৩ শতাংশই এককভাবে প্রদান করে থাকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারের যেকোনো কৃষিবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যাংকটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক এই সুবিধার ফলে প্রান্তিক চাষিরা ঋণগ্রস্ততার বিষচক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেলেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পূর্বে খেলাপী বা অনাদায়ী হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকায় যেসব কৃষক নতুন ঋণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন, ঋণ পরিশোধ ও মওকুফের সনদের মাধ্যমে তারা পুনরায় নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার আওতায় চলে এসেছেন। এর ফলে তারা আসন্ন ফসল মৌসুমে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা, উন্নত বীজ ও সার সংগ্রহ এবং চাষাবাদের সুবিধার্থে ব্যাংক থেকে নতুন করে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রান্তিক কৃষকদের ঘাড়ে জমে থাকা ঋণের চাপ কমলে তারা মানসিক ও শারীরিকভাবে নতুন উদ্যমে উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে পারেন। এটি কেবল চাষির ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনের স্বস্তি এনে দেয় না, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক সুরক্ষাতেও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। সময়মতো প্রয়োজনীয় ঋণের সরবরাহ নিশ্চিত হলে মাঠপর্যায়ে ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি, প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের গতিশীলতা তৈরি হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক দেশের কৃষি উন্নয়ন, কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ প্রসারে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছে। ব্যাংকটির দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সুনিপুণ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারের কৃষিবান্ধব নীতিমালা ও যেকোনো কল্যাণমুখী কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে ব্যাংকটি নিজস্ব সক্ষমতা দিয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ