বস্ত্র খাতের সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন, খাত পুনরুদ্ধারে দেড় বছর সময় চেয়েছে বিটিএমএ

বস্ত্র খাতের সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন, খাত পুনরুদ্ধারে দেড় বছর সময় চেয়েছে বিটিএমএ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বস্ত্র ও টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান বিভিন্ন জটিল সংকট নিরসনে অর্থ উপদেষ্টা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার। গঠিত এই কমিটি প্রাথমিক ও উপজাত বস্ত্র খাতের সার্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে এবং দ্রুততম সময়ে সমাধানমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করবে। সরকারের এই ইতিবাচক পদক্ষেপে দেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের মন্থর গতি কাটিয়ে ওঠার নতুন পথ উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বুধবার সকালে সচিবালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। তিনি সরকারের এই শীর্ষ পর্যায়ের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বস্ত্র খাতের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সমস্যাগুলো অনেক পুরোনো ও জটিল। পূর্ববর্তী সময়ে যথাযথ দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার অভাবে এই খাতের সমস্যাগুলো ক্রমশ ঘনীভূত হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারের নেওয়া সংস্কার ও গঠনমূলক পদক্ষেপগুলোর সুফল পেতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে। আনুমানিক দেড় বছর মেয়াদের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বস্ত্র খাত একটি শক্ত ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। উদ্যোক্তারা পূর্ণ ধৈর্য ধরে সরকারকে এই প্রয়োজনীয় সময় ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছেন।

আলোচনায় বিটিএমএ সভাপতি বিশেষভাবে তুলে ধরেন শিল্প খাতের প্রধান দুই অন্তরায়—জ্বালানি সংকট ও আর্থিক জটিলতার কথা। বর্তমানে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র অপ্রতুলতার কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে কারখানা পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয়, যা দেশীয় সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তুলছে। জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব কেবল দেশীয় বাজারের চাহিদাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিদ্যমান তারল্য পরিস্থিতি এবং ঋণের অতিরিক্ত ব্যয় উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈঠকে এসব অর্থসংক্রান্ত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প মালিকদের স্বস্তি দিতে এবং উৎপাদন ব্যয় কিছুটা লাঘব করতে সরকার ইতোমধ্যেই পাঁচ শতাংশ হারে বিশেষ নগদ প্রণোদনা প্রদান করছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, এই প্রণোদনা সাময়িকভাবে তাদের পরিচালন ব্যয় কমাতে এবং নগদ অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। সরকারের এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।

সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশে বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া বস্ত্র ও সুতা কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়, তবে অত্যন্ত দ্রুত ও তড়িৎ গতিতে অন্তত ১৫ লাখ মানুষের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর এই অর্থনৈতিক যুক্ততা দেশের সামগ্রিক বেকারত্ব নিরসন এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে বন্ধ কারখানাগুলো লাভজনকভাবে পুনরায় চালু করা এবং সচল কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের অসাধু বাণিজ্য আচরণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিটিএমএ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রির যে ‘ডাম্পিং’ প্রথা চলছে, তার ফলে দেশীয় উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিদেশি সস্তা কাপড় ও সুতার অন্যায্য প্রবেশ ঠেকানো না গেলে দেশীয় টেক্সটাইল শিল্প রক্ষা করা কঠিন হবে। তাই এই খাতে পর্যাপ্ত শুল্ক সুরক্ষা ও ডাম্পিং-বিরোধী নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে, সরকার ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সমন্বিত ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে বস্ত্র খাত আবার তার গতিশীলতা ফিরে পাবে বলে খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক নীতি সহায়তা এবং ডাম্পিং প্রতিরোধ করা গেলে আগামী দিনে দেশের বস্ত্র শিল্প জাতীয় রপ্তানি আয়ে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ