রেড সি অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা: ইয়েমেনে যৌথ বাহিনীর হামলার পর সৌদি আরবের ইয়ানবুতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

রেড সি অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা: ইয়েমেনে যৌথ বাহিনীর হামলার পর সৌদি আরবের ইয়ানবুতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হামলার জবাবে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত বন্দরনগরী হোদাইদাহে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের পর সম্ভাব্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির আশঙ্কায় সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিল্পনগরী ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ইয়ানবু প্রদেশে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সর্বোচ্চ আগাম নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছিল দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বিপদ কেটে গেছে বলে নিশ্চিত করে সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।

সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জাতীয় আগাম সতর্কীকরণ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইয়ানবু প্রদেশের সাধারণ অধিবাসীদের সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়। প্রাথমিক বার্তায় সম্ভাব্য হুমকির সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা না হলেও, কৌশলগত ঝুঁকি এড়াতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও জরুরি প্রতিরক্ষা সংস্থাসমূহকে তাৎক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়। পরবর্তীতে জারি করা এক হালনাগাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতির মূল্যায়ন শেষে আশু বিপদ অপসারিত হয়েছে এবং জারি করা সতর্কতাটি আর কার্যকর নেই। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো বৈষয়িক বা অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি।

এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট লোহিত সাগরের লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা সুসংহত করার লক্ষ্যে ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী হোদাইদাহ অঞ্চলে হুথিদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত বিমান ও সুনির্দিষ্ট আঘাত হানে। সামরিক জোটের সূত্রের খবর অনুযায়ী, লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক নৌযানগুলোর ওপর একাধিক হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই আনুপাতিক সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট গুরুত্ব দিয়ে জানানো হয়, বেসামরিক অর্থনীতি কিংবা সাধারণ জনগণের জন্য ব্যবহৃত হোদাইদাহ সমুদ্রবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। ইয়েমেনের সবগুলো প্রধান বন্দরই আন্তর্জাতিক সমুদ্র চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং সেখানে কোনো নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়নি।

অন্যদিকে, হুথি বিদ্রোহীরা এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, যৌথ বাহিনীর সামরিক বিমানগুলো আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ইয়েমেনের কামারান দ্বীপ এবং হোদাইদাহে অবস্থিত দেশের প্রধান টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোগুলোতে হামলা চালিয়েছে। হুথিদের রাজনৈতিক দপ্তরের পক্ষ থেকে এই আক্রমণকে অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগর এবং বাব এল-মানদে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সৌদি আরবগামী ও দেশটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নৌযানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে আসছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরটির কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান খনিজ তেল রফতানি টার্মিনাল ও বৃহৎ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এই স্থানটিতে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সৃষ্টি হওয়া অস্থিতিশীলতার মাঝে লোহিত সাগরের এই বিকল্প সরবরাহ রুটটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের জলপথভিত্তিক তৎপরতা এবং যৌথ বাহিনীর সামরিক প্রত্যুত্তরের কারণে নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাব এল-মানদে প্রণালীসহ সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় সমুদ্রগামী সব ধরনের নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষামূলক নজরদারি বহাল রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহন সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লোহিত সাগরীয় জলসীমায় সাম্প্রতিক এই সামরিক তৎপরতার কারণে বিশ্বজুড়ে নৌযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিজস্ব রুট ও গতিবিধি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা লোহিত সাগরীয় কৌশলগত বাণিজ্যিক রুটে নিবিড় আকাশ ও নৌ টহল জোরদার করেছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ