আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যৌন হয়রানি ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক বিশেষ অধিবেশনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটে এ ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৮২টি রাষ্ট্র তাকে পদচ্যুত করার পক্ষে মতামত প্রদান করে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত অবসান ঘটল।
আইসিসি সূত্রে জানা গেছে, বিচারিক আদালতের প্রশাসনিক ও পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটি করিম খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায়। এর আগে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ এনে আদালতের পরিচালনা পর্ষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি স্থায়ী সিদ্ধান্তের জন্য আইসিসির সদস্য দেশগুলোর পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টি’র নিকট পাঠানো হলে অধিকাংশ রাষ্ট্র তাকে অপসারণের পক্ষে ভোট দেয়। আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে কোনো প্রধান প্রসিকিউটরকে এভাবে পদচ্যুত করার ঘটনা এবারই প্রথম।
যুক্তরাজ্যের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী করিম খান ২০২১ সালে নয় বছর মেয়াদে আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মেয়াদে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বেশ কিছু প্রভাবশালী এবং বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিচারে আইসিসির অবস্থানকে সুদৃঢ় করলেও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সংস্থাটির মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি করে।
আইসিসির আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, করিম খানের এই অপসারণের ফলে ইতিপূর্বে আদালত কর্তৃক জারি করা কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা চলমান মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি প্রভাব পড়বে না। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম তার নিজস্ব আইনি ধারায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, নিজের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ শুরু থেকেই দৃশ্যত অস্বীকার করে আসছেন করিম খান। ২০২৪ সালে যখন এই যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো প্রথম প্রকাশ্যে আসে, তখন তার আইনি দল দাবি করেছিল যে, ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে।
হয়রানি বা জবরদস্তিমূলক আচরণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তার প্রধান আইনজীবী তাইয়াব আলী এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, করিম খানকে অপসারণের ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তাকে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত এবং ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করে তারা এই সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক ও আইনি মানদণ্ডবহির্ভূত বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে করিম খানের আইনি দল এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সকল আন্তর্জাতিক আইনি ফোরামে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
প্রধান প্রসিকিউটরের পদ খালি হওয়ায় আইসিসির কার্যপ্রণালী অনুযায়ী দ্রুতই নতুন একজন অন্তর্বর্তীকালীন প্রসিকিউটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংস্থাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কঠোরতা বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে।


