আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করতে উত্তর কোরিয়া থেকে আরও প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য আনার সার্বিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছে ক্রেমলিন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক সান্ধ্যকালীন ভিডিও বার্তায় মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার এই বর্ধিত সামরিক সহযোগিতার চিত্র তুলে ধরেছেন। কিয়েভের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, নতুন করে আসা এই বিপুলসংখ্যক সামরিক সদস্যকে অভ্যর্থনা জানানো, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাদের আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ভোরোনেঝ অঞ্চলে গত জুন মাস থেকেই অবকাঠামোগত প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার এই গভীর সামরিক সখ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির ধারাবাহিকতায় উত্তর কোরিয়া প্রথম দফায় তাদের এলিট স্পেশাল ফোর্স থেকে প্রায় ১৪ হাজার সৈন্য রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে পাঠায়। ইউক্রেনীয় বাহিনীর সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত অনুপ্রবেশ হামলা প্রতিহত করা এবং ক্ষেত্রবিশেষে রুশ সীমান্ত পুনরুদ্ধার অভিযানে উত্তর কোরীয় এই সেনারা রুশ কমান্ডের অধীনে সরাসরি অংশ নেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল নতুন সেনা সমাবেশেই ক্রেমলিন ও পিয়ংইয়ং তাদের পারস্পরিক আদান-প্রদান সীমাবদ্ধ রাখছে না। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক বা লঞ্চার সরবরাহ করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পিয়ংইয়ং ইতোমধ্যে মস্কোকে কয়েক মিলিয়ন কামানের গোলা, রকেট এবং কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ সিরিজের স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। এখন পুনরায় অতিরিক্ত শক্তিমত্তা যুক্ত করতে কৌশলগত যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠানোর নতুন নীল নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ইউক্রেনীয় সীমান্তের যুদ্ধক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত সৈন্য ও সমরাস্ত্র মোতায়েন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং এশিয়া মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে বলে সতর্ক করেছেন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপ্রধান। ইউক্রেনের অভিমত, ইউরোপের এই ড্রোন ও আধুনিক সমরাস্ত্রনির্ভর সরাসরি রণক্ষেত্রে অংশ নিয়ে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করছে এবং নিজেদের যুদ্ধকৌশল শাণিত করছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তিগত সহায়তায় তারা নিজেদের অস্ত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে পিয়ংইয়ংয়ের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আওতায় থাকা পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সার্বিক নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়বে।
পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে মস্কো ও পিয়ংইয়ং যে সামরিক অক্ষ গড়ে তুলেছে, তা বৈশ্বিক নিরাপত্তাকাঠামোকে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। উত্তর কোরিয়া থেকে সেনা ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ গ্রহণের বিনিময়ে রাশিয়া পিয়ংইয়ংকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, জ্বালানি, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং উপগ্রহ ও সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়া নিজেদের অভ্যন্তরীণ সেনা ঘাটতি পূরণ ও নতুন করে পূর্ণমাত্রার সেনা সমাবেশ এড়াতে উত্তর কোরিয়ার এই পদাতিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছেন।
উত্তর কোরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে কিয়েভ। ইউক্রেন সরকার তাদের কাছে থাকা গোয়েন্দা তথ্যসমূহ ন্যাটো এবং এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করে সমন্বিত কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে। সীমান্তে অতিরিক্ত ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সৈন্যের সম্ভাব্য উপস্থিতি যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন্দলময় করার পাশাপাশি বৈশ্বিক কূটনীতিকে এক তীব্র মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


