জ্বালানি খাতে তীব্র সংকটের মুখে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ঘিরে দেশি-বিদেশি তৎপরতা

জ্বালানি খাতে তীব্র সংকটের মুখে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ঘিরে দেশি-বিদেশি তৎপরতা

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

জাতীয় চাহিদার তুলনায় তীব্র সরবরাহ ঘাটতি এবং বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম গ্যাস সংকট। এমন এক বাস্তবতায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ‘তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল’ স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। বিলিয়ন ডলারের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের শীর্ষ স্থানীয় বেসরকারি জ্বালানি খাত সংলগ্ন গোষ্ঠী নতুন করে তাদের উদ্যোগ চালনা করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করতে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছে। চলতি সপ্তাহেই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাদের সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। চীনভিত্তিক সিএমসি গ্রুপের সহযোগিতায় এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক প্রস্তাব পেশ করতে যাচ্ছে। সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর বাইরে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হওয়া নিয়ে নীতি-কৌশলগত মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে।

অন্যদিকে, বিগত সরকারের আমলে বিশেষ আইনের অধীনে প্রাপ্ত এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক বাতিল হওয়া চুক্তিটি পুনর্বহালের মাধ্যমে পুনরায় প্রকল্পে ফেরার চেষ্টা করছে দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ। পেট্রোবাংলার চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি দেশের উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছিল, যা বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলাকে দেওয়া এক পত্রে জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে তারা আদালত থেকে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেবে। সামিটের দাবি অনুযায়ী, অনুমোদন ও সমঝোতা চূড়ান্ত হলে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে তারা এই তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ ও চালু করতে সক্ষম। তবে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ এবং কার্যালয় দেশের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক প্রস্তাবে সরকারের মনোভাব বেশ সতর্কতামূলক বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের গ্যাস খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত চার বছর ধরেই মূলত মহেশখালী বা কক্সবাজার উপকূলে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পূর্ববর্তী সময়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এটি বাস্তবায়নের চুক্তি হলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ এনে ওই চুক্তি বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তাদের বিনিয়োগের সময়সীমা ও অতিরিক্ত কঠোর শর্তাবলির কারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তা আর এগোয়নি। সম্প্রতি ১২টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি উন্মুক্ত রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) আহ্বানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন জটিলতায় সেই দরপত্র উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত স্থগিত বা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক বা সমঝোতাভিত্তিক পদ্ধতিতে মেগা চুক্তি সম্পাদনের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিদ্যমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এই সরবরাহ করা গ্যাসের একটি বড় অংশ (প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট) আসে আমদানি করা এলএনজিভিত্তিক বিদ্যমান দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে। এর একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আবাসিক খাতের গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সুদূরপ্রসারী। জ্বালানি সংকটের কারণে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি হিসাবমতে, নতুন গ্যাস সংযোগের জন্য বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮৫৭টি আবেদন ঝুলে রয়েছে। এমনকি সাড়ে ৫০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চার বছর আগে ডিমান্ড নোটের পুরো অর্থ পরিশোধ করা সত্ত্বেও গ্যাসের অভাবে উৎপাদন শুরু করতে পারছে না। ফলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইলসহ ভারী শিল্প উৎপাদনে বড় ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল সম্পর্কিত আইনি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার অবসান ঘটিয়ে একটি টেকসই ও মেধাভিত্তিক সিদ্ধান্তে আসা আবশ্যক বলে মনে করছেন দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ