দেশীয় সত্তা ছাড়া বিদেশি প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বন্ধের উদ্যোগ, খসড়া নীতিমালার প্রকাশ

দেশীয় সত্তা ছাড়া বিদেশি প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বন্ধের উদ্যোগ, খসড়া নীতিমালার প্রকাশ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশে স্থায়ী কোনো কোম্পানি বা নিবন্ধিত সত্তা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান আর ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না—এমন কঠোর বিধান রেখে ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত এই নীতিমালার ফলে ফেসবুক, গুগল বা ইউটিউবের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোকে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার বা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। একই সঙ্গে দেশে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য রাজস্ব পরিশোধ করতে হবে। গত ২২ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে সর্বসাধারণ ও অংশীজনদের জনমত গ্রহণের জন্য এই খসড়া নীতিমালাটি উন্মুক্ত করা হয়।

প্রকাশিত খসড়া নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাণিজ্যে স্বচ্ছতা আনা, ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় রাজস্ব সুরক্ষা করাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। নতুন বিধিনিষেধ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো প্রকার ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার, পণ্য বিক্রি কিংবা সেবা প্রদানের আগে বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) সনদ গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি (ওভার-দ্য-টপ) প্ল্যাটফর্মে কেবল আইনগতভাবে বৈধ পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এমন কোনো বিভ্রান্তিকর, নকল বা নিষিদ্ধ পণ্যের প্রচারণা সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে।

সীমান্ত পেরিয়ে ডিজিটাল অর্থ লেনদেনপ্রক্রিয়া সুগম ও নিরাপদ করতে এই নীতিমালায় বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংক ও পেমেন্ট ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তদারকিতে ‘ক্রস-বর্ডার এসক্রো সেবা’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কেনাকাটায় অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। এছাড়াও নিবন্ধিত ই-কমার্স বা ডিজিটাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাগুজে জটিলতা কমাতে সমন্বিত আইনি ব্যবস্থার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিল অব এন্ট্রি বা ইনভয়েসে গ্রাহকের তথ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা মার্কেটপ্লেসের স্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে রপ্তানি প্রসারে একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট নীতিসহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পার্সেলভিত্তিক ক্ষুদ্র রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা, বীমা প্রবর্তন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর নানা পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রাকে প্রচলিত পণ্য রপ্তানি আয়ের মতো বিবেচনা করে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি সহজ করতে বেসরকারি খাতে প্রসেসিং সেন্টার, আন্তর্জাতিক ওয়্যারহাউস, ড্রপ শিপিং ও মার্চেন্টিং ট্রেডে সমন্বিত সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংঘটিত জালিয়াতি, প্রতারণা এবং ভোক্তা হয়রানি বন্ধে নীতিমালায় কঠোর অনুশাসন যুক্ত করা হয়েছে। অনলাইন জুয়া, বেটিং, লটারি বা যেকোনো অবৈধ পণ্যের কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। গ্রাহক যদি চুক্তি অনুযায়ী বা সঠিক মানের পণ্য না পান, তবে বিক্রেতা সংস্থা সেই পণ্য ফেরত নিতে এবং পরিশোধিত পুরো অর্থ যে মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছিল, সেই একই পেমেন্ট মাধ্যমে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রেজুলেশন’ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।

বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অনলাইন কেনাকাটা ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সুনির্দিষ্ট আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের নীতিমালার অভাবে জাতীয় রাজস্ব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল এবং ভোক্তাদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। নতুন এই আইন বাস্তবায়ন হলে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলো প্রত্যক্ষ জবাবদিহির আওতায় আসবে। তবে নীতিমালার সুফল পাওয়ার বিষয়টি মূলত বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিধিবিধানসমূহ যথাযথভাবে পরিপালন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খসড়া নীতিমালার ওপর সংশ্লিষ্ট খাত ও সর্বসাধারণের পরামর্শ নেওয়া হবে। আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত মতামত যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে নীতিমালাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ