ইরান সংঘাতের মুখে অস্ত্র ঘাটতির দাবি ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান, এআই চিত্রে চড়ছে উত্তেজনার পারদ

ইরান সংঘাতের মুখে অস্ত্র ঘাটতির দাবি ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান, এআই চিত্রে চড়ছে উত্তেজনার পারদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ ও নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্রভাণ্ডার হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অস্ত্রের মজুত রয়েছে। তবে অস্ত্র ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যেই নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বেশ কিছু উসকানিমূলক ছবি প্রকাশ করে নতুন করে মনস্তাত্ত্বিক উত্তাপ ছড়িয়েছেন ট্রাম্প।

সম্প্রতি মার্কিন সামরিক অধিনায়কদের বৈঠকের তথ্য প্রকাশ করে এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন হোয়াইট হাউসকে এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে সতর্ক করেছেন। ওই ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ক্রমশ কমে আসছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ঘাঁটির সুরক্ষা এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তবে এই উদ্বেগের খবরকে সরাসরি উড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক জবাবে বলেন, ওয়াশিংটনের গোলাবারুদের মজুত সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সামরিক বাহিনীর প্রস্তুত থাকার কোনো ঘাটতি নেই।

এদিকে সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এই বিতর্কের উত্তাপ না কমতেই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এআই প্রযুক্তিতে নির্মিত একাধিক বিতর্কিত ছবি পোস্ট করেন। ছবিগুলোতে সরাসরি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর হামলার অবয়ব চিত্রায়িত হয়েছে। এর একটিতে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের সামরিক ও প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় আকাশপথে যুদ্ধবিমান থেকে ব্যাপক বোমাবর্ষণের চিত্র ফুটে ওঠে। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনীতিতে খার্গ দ্বীপের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, কাল্পনিক এই চিত্রটি প্রকাশের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত প্রদান করেছে।

প্রকাশিত অন্য একটি এআই ছবিতে মার্কিন পতাকাবাহী এক বিশাল তেলবাহী জাহাজের ডেকের ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যার নিচে ক্যাপশনে ইরানি জাহাজটি চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এছাড়া সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে ইরানি পতাকাবাহী আন্তর্জাতিক জলযানে অভিযান ও নৌযান জবরদখলের রূপক চিত্রও সেখানে তুলে ধরা হয়। সমরবিদরা বিষয়টিকে বাস্তব সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, কোনো প্রত্যক্ষ হামলা চালানোর আগেই ডিজিটাল ও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে শত্রু পক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল অবলম্বন করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষক ও ভূরাজনৈতিক সামরিক গবেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ সামরিক মূল্যায়ন এবং প্রকাশ্য শীর্ষ পদের বক্তব্যের মধ্যে এই বৈপরীত্য বিশ্বজুড়ে কৌতুহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একদিকে শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কমে যাওয়ার বাস্তবিক পরিসংখ্যান, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সীমাহীন গোলাবারুদ থাকার দাবি সামরিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাকে সামনে আনে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পথ সচল রাখা যেখানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য প্রধান অগ্রাধিকার, সেখানে প্রধান তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ দ্বীপে হামলা কিংবা তেলবাহী নৌযান দখলের প্রচার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যে চরম অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

একদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য মিললেও আমেরিকান রাষ্ট্রপ্রধানের এই ধরনের সামরিক হুমকি ও আগ্রাসী বার্তা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ সংঘাতের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমরকৌশলবিদরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ডিজিটাল বার্তা ইরানকে নতুন করে প্রতিরক্ষামূলক বা পাল্টা ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কূটনীতির পথ রুদ্ধ করে পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ