অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও সংবেদনশীল পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল রাখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত আধুনিক ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের কৃষি, খাদ্য ও শিল্প খাতের উৎপাদিত এবং আমদানিনির্ভর সংবেদনশীল পণ্যগুলোর বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতেই এই কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ই-কমার্স বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেন। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান সভাপতিত্ব করেন। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট খাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় পণ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে সরবরাহ শৃঙ্খলের আকস্মিক ঘাটতি। স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে অভ্যন্তরীণ বাজারে তার দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকারের এই নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—কোনো পণ্য যেন বাজার থেকে হঠাৎ উধাও না হয়ে যায় এবং দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা না তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় নীতিগত বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ডাল, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন, মৌসুমি চাহিদার ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর সরবরাহ সক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কোনো বিশেষ বছর দেশীয় চাল বা ডাল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ফসল কাটার বহু আগেই বিকল্প আমদানির প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখতে হবে। নতুন এআই ব্যবস্থাটি ১০ বছরের ঐতিহাসিক বাজার তথ্য, দেশীয় উৎপাদনচিত্র, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডাটা এবং বৈশ্বিক ওপেন সোর্স ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক তথ্য উৎস এক জায়গায় এনে নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হবে।
বর্তমানে কোনো পণ্যের ঘাটতি পূরণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা তা অনেকটাই লাঘব করবে। যেখানে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনায় দিনের পর দিন সময় লেগে যেত, সেখানে আধুনিক এআই অ্যালগরিদম মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারের সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরতে পারবে। এর ফলে কখন, কোন দেশ থেকে, কত দামে পণ্য ক্রয় করলে দেশ ও ভোক্তা উভয়ই উপকৃত হবে—তা তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে তথ্যের নির্ভুলতার ওপর। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমৃদ্ধ ও হালনাগাদ কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় বলা হয়, এআইভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্মের প্রাথমিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো তৈরিতে কিছুটা সময় লাগলেও এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে তা বাজারের ওপর মানুষের প্রথাগত পর্যালোচনার চেয়ে অনেক দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নিখুঁত তথ্য সরবরাহ করতে পারবে।
নতুন এই সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে তা দেশে পণ্যের বাজার তদারকিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে অসাধু সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা নস্যাৎ হওয়ার পাশাপাশি সারা বছর নিত্যপণ্যের বাজার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।


