জাতীয় ডেস্ক
পাস হওয়ার তিন মাসের মাথায় আবারও সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন প্রস্তাবে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’ সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি বৃদ্ধি এবং শাস্তি আরও কঠোর করার সুপারিশ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সংশোধনী বিলটি জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই উত্থাপন করা হতে পারে।
খসড়া সংশোধনী অনুযায়ী, সাইবার স্পেসে সামাজিক অস্থিরতা, বিভ্রান্তি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে—এমন অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্যকে ‘গুজব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচারিত মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যকে ‘অপতথ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। এই ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইনটির ২৫ নম্বর ধারায় পরিবর্তন এনে ডিজিটাল মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে কঠোর বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারো মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। এই ধরনের অপপ্রচারের শিকার যদি কোনো নারী কিংবা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু বা কিশোর হন, তবে সাজা বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে রূপ নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে এনফোর্সমেন্ট বা বাস্তবায়ন ব্যবস্থার পরিধিও সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকে বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) প্রধান ভূমিকা পেতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ও তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই আইনটি দ্রুত যুগোপযোগী করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে আইনবিদ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ শব্দের ব্যাখ্যা আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট করা না হলে আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে, যা স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করতে পারে। তাই সব অংশীজনের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সংশোধনী আনাই যুক্তিসঙ্গত হবে বলে মনে করেন তারা। এমনকি প্রশাসনিক পর্যায়েও এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে; আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও নেতিবাচক সমালোচনার কথা চিন্তা করে সতর্কভাবে এগোনোর মত দিচ্ছেন কেউ কেউ।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৮ সালে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকার ওই আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে। এরপর চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল সংসদে সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হয়। সেই আইন কার্যকরের মাত্র তিন মাসের মধ্যে নতুন এই সংশোধনী প্রস্তাব আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


