কূটনীতি ও ঐতিহ্য ডেস্ক
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে রাজশাহীতে তিন দিনব্যাপী এক বহুমুখী সফর সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। সফরকালে তিনি উত্তরাঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। এ সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের ইতিহাস ও জীবনযাত্রার সাথে সরাসরি পরিচিত হওয়া এবং শিক্ষা, জলবায়ু ও প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করা।
সফরের প্রথম দিন গত সোমবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিমানবন্দরে পৌঁছেই ফরাসি রাষ্ট্রদূত স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি নগরীর ঐতিহ্যবাহী সাহেববাজার এলাকার স্থানীয় মিষ্টান্ন ভান্ডার পরিদর্শন করে আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার রাষ্ট্রদূত নাটোরের চলনবিল, ঐতিহাসিক উত্তরা গণভবন, রানী ভবানীর রাজবাড়ি এবং পুঠিয়া রাজবাড়ি ও মন্দির কমপ্লেক্স সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। চলনবিলে নৌকাভ্রমণের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ জলরাশি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। পথিমধ্যে পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম তাঁর নজর কাড়ে। এছাড়া স্থাপত্যশৈলী ও প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ অবস্থা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। পরবর্তীতে তিনি পুঠিয়ার বিখ্যাত বানেশ্বর আমের হাট পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় করে আঞ্চলিক অর্থনীতি ও কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেন।
উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্প পুনরুজ্জীবিতকরণ ও বিশ্ববাজারে এর সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রদূত রাজশাহী সরকারি রেশম কারখানা পরিদর্শন করেন। সেখানে গুটি থেকে সুতা আহরণ এবং সুতা থেকে বস্ত্র তৈরির পর্যায়ক্রমিক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। রেশম বস্ত্র প্রক্রিয়াজাতকরণে নিজস্ব অংশীদারত্ব হিসেবে তিনি কাপড়ে রং করার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং স্মারক হিসেবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেশমি বস্ত্র সংগ্রহ করেন। এছাড়া তিনি বেসরকারি খাতের রেশম উৎপাদন ও বিপণনকেন্দ্রগুলোও ঘুরে দেখেন।
সফরের তৃতীয় দিন বুধবার রাষ্ট্রদূত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) পরিদর্শনে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর’ শীর্ষক এক বিশেষ সেশনে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি রাবির ঐতিহাসিক প্যারিস রোড এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য পরিদর্শনের পাশাপাশি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সমৃদ্ধ প্রত্ননিদর্শন, প্রাচীন ভাস্কর্য ও শিলালিপি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সফরের শেষভাগে তিনি পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন।
ঢাকা প্রত্যাবর্তনের পূর্বে রাষ্ট্রদূত আঞ্চলিক সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজধানী ঢাকার বাইরে এসে স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা, বাজার ব্যবস্থা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব ধরণের উন্নয়ন ও কূটনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকারের সাথে নিবিড় অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণে দুই দেশের দীর্ঘ ২৫ বছরের যৌথ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি আগামীতে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


