স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ ডেস্ক
রোগ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, কেবল ওষুধ দিয়ে কোনো জাতিকে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এ জন্য শিশুকাল থেকে অর্থাৎ ‘জিরো’ বয়স থেকেই উদ্ভাবনী ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে (নিপসম) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব খাতে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানার সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ নীতি নির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবার মানবিক দিকটির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকের হাসিমুখ এবং সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ একজন রোগীর মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং রোগীকে অর্ধেক সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করে। অসুস্থ ও অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিকিৎসকদের ভূমিকা অপরিসীম উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধুমাত্র ট্যাবলেট বা ওষুধ নির্দেশ করা চিকিৎসকের একমাত্র কাজ নয়। রোগীদের যথাযথ পরামর্শ ও আশ্বস্তকরণও চিকিৎসার একটি বড় অংশ। তিনি চিকিৎসকদের নিজেদের এমনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেন তাঁদের আচরণেই রোগী আশ্বস্ত হতে পারেন।
দেশে অসংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে ক্যান্সার ও কিডনি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব মরণব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা সীমাহীন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন, যা একটি পরিবারের জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। এসব জটিল রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সরকারি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সাখাওয়াত হোসেন জানান, দেশের প্রতিটি প্রান্তে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অতি দ্রুত দেশব্যাপী এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে তোলা, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এবং মা ও নবজাতকের জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
অপুষ্টির প্রভাব তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিগত সময়ে হামে মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও সম্প্রতি পুষ্টির অভাবে কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নবজাতকদের শালদুধ না পাওয়া, উপযুক্ত বুকের দুধের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্যের ঘাটতিই এর মূল কারণ। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে মা ও শিশুদের সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এম এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশে দক্ষ স্বাস্থ্য গবেষক তৈরিতে নিপসম দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনি রোগ প্রতিরোধভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করার তাগিদ দেন। এছাড়া সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ‘হেলথ কার্ড’ চালুর পাশাপাশি একটি কার্যকর ও শক্তিশালী রোগী রেফারেল সিস্টেম সমন্বয় করার পরামর্শ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। বক্তারা স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় মানসম্মত গবেষণা ও নীতি নির্ধারণী বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন।


