অপরাধ ডেস্ক
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় নিজ বাড়িতে ঢুকে জালেমন (৭০) নামের এক প্রবীণ নারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা। নিহত নারী উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদের মা এবং ওই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মৃত আয়েজ উদ্দিনের স্ত্রী। গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার শোলাকুড়ি ইউনিয়নের দিঘিরপাড় এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একা বসবাস করার সুযোগ নিয়ে দুর্বৃত্তরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে করছে পুলিশ। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর সমগ্র এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নিহত জালেমন দীর্ঘ সময় ধরে দিঘিরপাড় এলাকার নিজ বসতবাড়িতে একাকী জীবনযাপন করছিলেন। ঘটনার দিন অর্থাৎ শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিবেশী রেজাউল করিমের স্ত্রী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এবং পান খাওয়ার উদ্দেশ্যে জালেমনের বাড়িতে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি ঘরের দরজা খোলা অবস্থায় দেখতে পান এবং ভেতরের মেঝেতে জালেমনকে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি মধুপুর থানা পুলিশকে অবহিত করেন।
খবর পাওয়ার পর মধুপুর থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ সদস্যরা নিহতের বসতঘর থেকে আলামত সংগ্রহ করার পাশাপাশি প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। মরদেহের ঘাড় ও মাথায় একাধিক ধারালো অস্ত্রের গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রাথমিক তল্লাশি ও ঘটনার ধরন দেখে পুলিশের ধারণা, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই আক্রমণ চালানো হয়ে থাকতে পারে। তবে নিহতের ঘর থেকে কোনো মালামাল বা অর্থকড়ি চুরি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও নিহতের স্বজনেরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মধুপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম ফজলুল হক জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ দল সেখানে পৌঁছায় এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে। তিনি বলেন, “হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। সুরতহাল শেষ করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য জেলা পুলিশ ও স্থানীয় অপরাধ তদন্ত শাখা যৌথভাবে কাজ করছে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্থানীয় প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে ঘটনাটি ঘিরে বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। নিহত জালেমনের ছেলে আবুল কালাম আজাদ স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। রাজনীতির মাঠে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি থাকায় এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক কোন্দল, পূর্বশত্রুতা কিংবা পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত কোনো বিরোধ জড়িত রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এখনই কোনো নির্দিষ্ট কারণকে মূল কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। তদন্তের স্বার্থে সকল সম্ভাব্য দিকই গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
প্রবীণ ও একাকী বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। গ্রামীণ এলাকায় একাকী থাকা বয়স্ক নারীরা প্রায়শই বিভিন্ন দুষ্কৃতকারীর নজরদারিতে থাকেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। শোলাকুড়ি ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং অবিলম্বে জড়িত ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সার্বিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ঘটনার রহস্য উদঘাটনে প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


