জাতীয় ডেস্ক
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি ঢাকা ও রিয়াদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন সামরিক ও কৌশলগত মাত্রা প্রদান করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের লোহিত সাগর অঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত আক্রমণ এবং অর্থনৈতিক নৌপথের সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তবে একই সাথে ইরানের সঙ্গে পারস্পরিক কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রেখে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার বার্তা দিয়েছে ঢাকা।
রবিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রতিনিধি দল দেশের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থান বিশদভাবে তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়া মানেই ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার দায়বদ্ধতা থেকেই এই জোটে শরিক হয়েছে।
লোহিত সাগর ও সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাণিজ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রচুর সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখাও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির তাগিদ থেকেই বাংলাদেশ এই সমন্বিত নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়।
ঢাকা ও রিয়াদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সরকারের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ কেবল শ্রমবাজার, হজ ও ওমরাহ পালনের মতো প্রথাগত খাতগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একে একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কে রূপ দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরব পবিত্র মক্কা ও মদিনার সুরক্ষাকারী দেশ হওয়ায় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দেশ হিসেবে যেকোনো নিরাপত্তা ও নৈতিক দরকারে তাদের পাশে থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যে উত্তেজনা থাকলেও বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা একটি উন্মুক্ত এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক নীতি মেনে চলছে। রিয়াদভিত্তিক জোটে যোগ দিলেও তেহরানের সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, ঢাকার এই যোগদান মূলত আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রতিরক্ষা ও ভৌগোলিক স্থিতিশীলতার উদ্দেশ্যে, যা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়।
একই প্রেস ব্রিফিংয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কৌশলগত উদ্যোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। উপদেষ্টা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আইনি প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে প্রাসঙ্গিক কূটনৈতিক নথিপত্র এবং আইনি ফাইল প্রস্তুত করেছে। এই বিষয়ে অগ্রগতি অর্জিত হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনগণকে অবহিত করা হবে বলে জানানো হয়। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক সমন্বয়ে প্রবেশ এবং অভ্যন্তরীণ আইনি অপরাধীদের ফেরত আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।


