অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারাবাহিকতার ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গতিশীলতা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন অর্থসংক্রান্ত বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হিসাব করার প্রক্রিয়ায় রিজার্ভের যে ভিন্নতা থাকে, তা দুটি পদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব বা গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬,৫৯২ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন ডলার, যা সংক্ষেপে ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল’ (বিপিএম-৬) অনুযায়ী নিট হিসাবের ভিত্তিতে দেশে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১,৭৭৬ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলার বা ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। মূলত আমদানি দায় মেটানো, বৈদেশিক দেনা পরিশোধ এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ডলার সরবরাহের পর অবশিষ্ট অর্থ নিয়ে এই হিসাব তৈরি করা হয়ে থাকে।
বৈদেশিক মুদ্রার এই প্রবাহ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ। ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে ডলার আসার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় রিজার্ভের ঝুড়ি ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া পরিসংখ্যানে জানা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টের শুরুতেই প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে অভাবনীয় উর্ধগতি দেখা গেছে। আগস্ট মাসের প্রথম তিন দিনেই (১ থেকে ৩ আগস্ট) দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৪০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের অর্জিত ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
কেবল এক দিনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেও এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত তথ্যানুসারে, গত ৩ আগস্ট এক দিনেই দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রদান, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নীতিগত নমনীয়তা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত (জুলাই থেকে ৩ আগস্ট) দেশে সর্বমোট ৩ দশমিক ২৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের ঠিক একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৬৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আগস্টের ৩ তারিখ পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ দশমিক ৯ শতাংশ নিট প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ। রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা বাড়ে। বেশ কিছু সময় ডলার সংকট এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার চাপ সামলাতে গিয়ে রিজার্ভ কিছুটা চাপে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসা উৎসাহিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বাস্তব সুফল দিতে শুরু করেছে।
রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা এবং রিজার্ভের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ডলার বাজারকে স্থিতিশীল করতে সরাসরি সহায়তা করবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো তাদের বৈদেশিক দেনা ও আমদানি ঋণপত্র (এলসি) সহজেই নিষ্পত্তি করতে পারবে, যা দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে রিজার্ভের পরিমাণ আরও সুসংহত হবে।


