স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ডেস্ক
দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশার কামড়ে সৃষ্ট এই জ্বরে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৭১ জন রোগী। তবে এই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগেই নতুন করে রোগী শনাক্তের হার বাড়ছে, যা ডেঙ্গু পরিস্থিতির সার্বিক অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের হাসপাতালগুলোতে। গত একদিনে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২৪০ জন ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে ৬৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ৫৩ জন, খুলনায় ৫০ জন, রাজশাহীতে ২৬ জন, ময়মনসিংহে ২৩ জন, রংপুরে ১২ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভৌগোলিক বিস্তৃতির এই চিত্র নির্দেশ করে যে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেবল রাজধানী বা প্রধান শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতেও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১৭ হাজার ৭৮০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে বড় একটি অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন মোট ১৬ হাজার ৫৪০ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের একটি অংশের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, তবুও সার্বিক মৃত্যুসংখ্যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো হাসপাতালে না আসা, সঠিক সময়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা না করানো এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে, যার ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির তুলনায় চলতি বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গু এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন মোট ৪১৩ জন। বিগত বছরের এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধির সাথে সাথে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে হাসপাতাল ভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে মশক নিধন ও প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়া বেশি জরুরি। আবাসিক এলাকাগুলোতে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, বাসাবাড়ির চারপাশে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করা এবং নিয়মিত ফগিং কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সাথে, কোনো ব্যক্তির শরীরে জ্বর বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।


