জ্বালানি খাতে গতি ফেরাতে নীতি সহজীকরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগে গুরুত্ব

জ্বালানি খাতে গতি ফেরাতে নীতি সহজীকরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগে গুরুত্ব

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং বর্তমান সংকট উত্তরণে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত না করে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে সৌরবিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল আমদানি এবং এলএনজি সরবরাহে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতে সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এসব কথা জানান।
জ্বালানি খাতে সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শুধু সাময়িক লাভ নয়, বরং শিল্প ও অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি। জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে এবং একক কোনো স্থাপনার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এলএনজি খাতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে কোনো বিশেষ দুর্ঘটনায় শিল্পক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের নতুন কৌশলের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি অর্জনে সৌরবিদ্যুৎ খাতে নীতিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কর অবকাশ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করে দুই মাসের মধ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ না বাড়িয়ে ‘ওপেক্স মডেল’-এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত এলাকা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে (রুফটপ) সৌর প্যানেল বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ক্যাবল টিভি বা ইন্টারনেট সেবার মতো রুফটপ সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক উপায়ে গ্রাহকের কাছে বিক্রির সুযোগ তৈরি করা হবে। এ ছাড়া বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির সংস্থান সহজ করতে সরকারি জমিকে মূলধন বা ‘শেয়ার’ হিসেবে ধরে যৌথ অংশীদারিত্বের নতুন মডেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে মন্ত্রী বলেন, পরিবেশগত কারণে উন্নত বিশ্ব ও অর্থায়নকারী সংস্থাগুলো এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরে আসছে। সে কারণে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এ ধরনের প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে এবং বিকল্প নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বেসরকারি খাতকে সরাসরি আমদানির অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে ছড়ানো গুজবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও আতঙ্কজনিত কেনাকাটা এবং কালোবাজারির মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সরকারি একক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে ভারতে প্রচলিত ব্যবস্থার মতো বেসরকারি খাতকেও আমদানির সুযোগ দিলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার হবে। তবে এ নীতিমালা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, বরং সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
খাতের সার্বিক অগ্রগতির জন্য সুশীল সমাজ, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আকর্ষণীয় এবং শিল্পের জন্য সহায়ক যেকোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব কালক্ষেপণ না করে অনুমোদন দেওয়া হবে। জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন। বক্তারা সংকট কাটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ঐকমত্য প্রকাশ করেন।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ