জাতীয় ডেস্ক
মানুষ ও হাতির মধ্যকার সংঘাত শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব না হলেও তা কমিয়ে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। এ লক্ষ্যে স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ, হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত অর্থ সহায়তা এবং ফসল বিমার ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ব হাতি দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বন অধিদপ্তরের হৈমন্তি মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বিশ্ব জুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’।
আলোচনা সভায় বনমন্ত্রী জানান, ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বন্য হাতি ২৬৮টি, পরিযায়ী হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতি রয়েছে ৯৬টি। বনাঞ্চল ধ্বংস, বনের ভেতর দিয়ে সড়ক, রেলপথ ও বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ, অবৈধ শিকার এবং আবাসস্থল সঙ্কটের কারণে বন্য হাতি আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন প্ল্যান’ গ্রহণ করেছে, যেখানে ৪০টি অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বন্যপ্রাণী দ্বারা আক্রান্ত জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা-২০২১’ অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লাখ, আহত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ এবং সম্পত্তি বা ফসলের ক্ষতির জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩2২টি নিহত পরিবার, ১৬৯ জন আহত ব্যক্তি এবং ৩,২১৫টি পরিবারের গৃহ ও পশু ক্ষতির বিপরীতে মোট ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে এই অর্থ দ্রুত ছাড় করার পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে বিমা চালু করার উদ্যোগ নিতে বন বিভাগকে নির্দেশনা দেন তিনি।
সংঘাত নিরসনে প্রযুক্তির ব্যবহার ও স্থানীয়দের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা রেঞ্জে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং হাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে ১৬০টি ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে ১০ জন সদস্য রয়েছেন, যারা লোকালয়ে হাতির আগাম বার্তা প্রদান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজ করছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে গৃহীত সরকারি হাতি প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আবাসস্থল সুরক্ষা এবং খাদ্যের সংস্থান প্রসঙ্গে তিনি জানান, বন্যপ্রাণীর উপযোগী ৩,২৪৮ হেক্টর খাদ্য-বাগান তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি, ভারত-বাংলাদেশের যৌথ সীমান্তে পরিযায়ী হাতির নিরাপদ চলাচলে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রটোকলের আলোকে পুনরায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, হাতি হত্যা, শিকার ও পাচারের মতো অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পোষা বা ক্যাপটিভ হাতির সুরক্ষায় তাদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ, সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল এবং পরিবেশ সচিব ড. ফাহমিদা খানম বক্তব্য রাখেন। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেসরকারি সংস্থা, গবেষক এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টাই হাতি সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


