অনলাইন অ্যাপে সহজ শর্তে ঋণের ফাঁদ: ব্ল্যাকমেইলে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ

অনলাইন অ্যাপে সহজ শর্তে ঋণের ফাঁদ: ব্ল্যাকমেইলে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ

অপরাধ ডেস্ক
ডিজিটাল মাধ্যমের বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সামান্য অর্থ ঋণ দিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার পর উচ্চ সুদ আদায়ের নামে শুরু হয় চরম ব্ল্যাকমেইল বা ব্লাকমেইল। এতে করে বর্তমানে দেশের হাজারো মানুষ সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে রয়েছেন। সম্প্রতি এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রতারক চক্রগুলোর কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইউটিউব ও ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে এসব চক্র। বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপস ইনস্টল করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহারকারীর ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চক্রের মূল সার্ভারে। এরপর প্রলোভন দেখিয়ে মাত্র ছয় হাজার টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়। ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র, বিভিন্ন কোণ থেকে তোলা ছবি এবং পরিবারের সদস্যসহ পরিচিতজনদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ঋণগ্রহীতাকে সাত দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করতে বলা হয়। কিন্তু গ্রাহক অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়ার পর দেখা যায়, সার্ভিস চার্জ ও প্রসেসিং ফি বাবদ বড় অংকের টাকা কেটে রেখে মাত্র চার হাজার আটশ টাকা প্রদান করা হয়। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সাত দিন পর আসল টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত সুদ যোগ করে দশ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। নির্ধারিত সময়ে এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুদের হার জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে, যা অনেক সময় পাঁচ শ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঋণের মেয়াদ শেষের দুই দিন আগে থেকেই শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। পঞ্চম দিনে নারী কর্মীরা ফোন করে তাগাদা দেন এবং ষষ্ঠ দিনে সময় চাওয়া হলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয়। এ পর্যায়ে গ্রাহকের ফোন থেকে হাতিয়ে নেওয়া ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত বা এডিট করে অসামাজিক রূপ দিয়ে তা পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত এসব চক্রে স্থানীয়ভাবে বেতনভুক্ত বাংলাদেশি ব্ল্যাকমেইলার ও কর্মীরা কাজ করছে।
গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর নর্দা কালাচাঁদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এমনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের চার নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মোছা. লিলুফা ইয়াসমিন, কাজলি রেখা, কাকলি আক্তার ও তানজিলা আক্তার। তাদের মধ্যে কেউ গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা তোলার কাজ করতেন, আবার কেউ ছবি এডিট করে ব্ল্যাকমেল করার মূল কাজটি পরিচালনা করতেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, ফিনক্যাশ ও পপক্যাশসহ বিভিন্ন অবৈধ অ্যাপের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হতো এবং গ্রাহকদের সমস্ত তথ্য চীনা সার্ভারে চলে যেত।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতিমধ্যে অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত এই ধরনের ঋণ কার্যক্রম থেকে সাধারণ মানুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। তবে সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতে চান না, যা এসব অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, ভুক্তভোগীরা এগিয়ে এসে অভিযোগ দায়ের করলে এ ধরনের অবৈধ আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি চক্রকে আইনের আওতায় আনা হবে।
অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ