বিচারব্যবস্থায় সংস্কার ও আধুনিকায়ন: সাত জেলায় ‘ই-বেইলবন্ড’ ব্যবস্থার উদ্বোধন

বিচারব্যবস্থায় সংস্কার ও আধুনিকায়ন: সাত জেলায় ‘ই-বেইলবন্ড’ ব্যবস্থার উদ্বোধন

জাতীয় ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দেশের সাতটি জেলায় ‘ই-বেইলবন্ড’ বা ইলেকট্রনিক জামিননামা পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। সোমবার সকাল ১১টায় বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই আধুনিক পদ্ধতির উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে তিনি জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনেরও দ্বারোদ্ঘাটন করেন।

বগুড়াসহ ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলায় এই প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা কার্যক্রম চালু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বিচারের আধুনিকায়ন ও হয়রানি লাঘব
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিচার বিভাগকে আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, সনাতন পদ্ধতিতে একটি জামিননামা আদালত থেকে জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে আইনজীবী, মুহুরি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অন্তত ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। এতে যেমন সময়ের অপচয় হতো, তেমনি বিচারপ্রার্থীদের নানা হয়রানির শিকার হতে হতো। নতুন ‘ই-বেইলবন্ড’ পদ্ধতিতে বিচারক জামিন আদেশ যাচাই করে সরাসরি অনলাইনে কারা প্রশাসনের কাছে পাঠাবেন। এর ফলে জামিন জালিয়াতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং দ্রুততম সময়ে কারামুক্তি নিশ্চিত হবে।

সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ব্যবস্থাকে পুলিশের সিডিএমএস (CDMS), আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অন্য জেলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জামিন শুনানি সহজ হবে এবং ভুয়া ওয়ারেন্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ হবে।

গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা
প্রধানমন্ত্রী দেশে আইনের শাসনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় ছাড়া নাগরিকরা গণতন্ত্রের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারে না।” দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আদালত যেন হয়রানির বদলে মানুষের আস্থার নিরাপদ স্থলে পরিণত হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন।

বক্তব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হলেও বর্তমান সরকার সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী বিচারকদের মুখ্য ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। তিনি বিচারকদের নৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

বিনাবিচারে কারাবন্দিদের বিষয়ে নির্দেশনা
দেশের কারাগারগুলোতে আইনজীবী নিয়োগের সক্ষমতা না থাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ বছরের পর বছর বিনাবিচারে বন্দি রয়েছেন বলে তথ্য প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। এই মানবিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি আইনমন্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।”

অনুষ্ঠানে আইন মন্ত্রণালয়, কারা কর্তৃপক্ষ এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আইনজীবী সমাজকে এই ডিজিটাল সেবা সাদরে গ্রহণ করার আহ্বান জানান। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড করার মাধ্যমে দেশে দুর্নীতিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত বিচারব্যবস্থা সুসংহত হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ